Home

উদিসা ইসলাম

Cartoons about gender

ঘটনাস্থল প্রেসক্লাব। জেন্ডার জাস্টিস অ্যান্ড ডাইভারসিটি অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি প্রশিক্ষণ বিভাগ এর একটা অনুষ্ঠান। (জেণ্ডার সমতা ও নারী নীতি বাস্তবায়ন বিষয়ে নারী সংসদ সদস্যদের করণীয় কর্মশালা)।

সংরক্ষিত আসনের নারী এমপিদের ডাকা হয়েছে। কথা বলবেন তাদের সাথে দেশের খ্যাতিমান জেণ্ডার এক্সপার্টরা। অফিসের এসাইনমেন্ট। অফিস থেকে সেখানে পাঠানোর সময় পইপই করে বলে দিয়েছেন সময়মতো যেতে, গুরুতর বিষয়ে আলাপ হবে। জেণ্ডার সমতা বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনার মধ্য দিয়ে বিষয়টা নিয়ে তাদের অবস্থান নিয়ে আলাপ করবেন তারা। আর নারী নীতি বাস্তবায়নে এই নারী এমপিরা কি দায়িত্ব পালন করতে পারেন সেটা তারা জানবেন এবং জানাবেন।

অনুষ্ঠান সকাল ৯টায়। মানে একঘন্টা আগে রওনা দিতে হবে বাসা থেকে। মানে ২ঘন্টা আগে ঘুম থেকে ওঠা। তালতলা থেকে প্রেসক্লাবতো কম দুরে না। হাসফাঁস করতে করতে দৌড়ে যখন প্রেসক্লাবে পৌঁছুলাম, নির্ধারিত সময়ের ১০মিনিট পার হয়ে গেছে। হায় হায় কি লজ্জা ভাবতে ভাবতে সিড়ি দিয়ে দোতলায় পৌছে প্রেসক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে দৌড়ে ঢুকে দেখি ঘর ফাঁকা। অনুষ্ঠান শুরু হয়নি। আয়োজকরা ৫জন হাজির হয়েছেন মাত্র। তারা বেশ আয়েশ করে গোল হয়ে বসে চা পান করছেন। একদিকে একটু স্বস্তি যে অনুষ্ঠান শুরু হয়নি (ছোট রুমে অনুষ্ঠান শুরুর পর ঢুকলে সবার নজরে পড়ে), আরেকদিকে বিরক্তি- কারণ আগামী ৩০ মিনিটেও শুরু হবে বলে মনে হচ্ছে না।

আমার হাতেও চায়ের একটা কাপ ধরিয়ে দিয়ে আয়োজকদের একজন বললেন- উদিসা অনেকদিন পর দেখলাম। মুটিয়েছ।

আমার মুখে তিক্ত-কাষ্ঠ হাসি (মোটা বলেছে বলেই হয়তো)।
মুখে হাসি রেখেই মাথার ভিতর ঘুরতে থাকলো- কারো সাথে দেখা হওয়ার শুরুতে মুটিয়েছো কোন কোন সম্পর্কের ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য আর কোন সম্পর্কের ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য না।

এসব নিয়ে এদিক ওদিক ভাবছি, ঠিক সেসময়ই ঢুকলেন দীপা হাফিজ (নামটা কাছাকাছি ফ্লেভার রেখে একটু পাল্টে দিলাম মাত্র)। তাকে দেখে আয়োজক পরমা দত্ত (নামটা আবারও পাল্টে দিলাম) বসা থেকে উঠতে গেলেন। হাতের চায়ের কাপ থেকে চা ছলকে পড়ে যা তা অবস্থা করে চিৎকার দিয়ে বলে উঠলেন- এইরে..কে এয়চে দেকো (উনি মশকরা করেই এভাবে বলছিলেন)…তারপর বললেন, আহা…কি দারুন একটা ঘড়ি পরেছো।

দীপা হাফিজ স্মিতহাসি দিলেন। একটু ভাব নিয়ে কানের কাছে গিয়ে কি একটা বললেন- প্রায় সাথে সাথে হা হা হাসি শুরু হয়ে গেলো। আবার এসবের মাঝে চোখ টিপে এটাও বললেন- এই থামো বড় পত্রিকার সাংবাদিক পাহারা দিতেসে। তখন দীপা হাফিজ বললেন- উদিসাতো আমাদের রিপোর্ট মানে নারীদের নিয়ে রিপোর্ট করতে করতে আমাদের লোকই হয়ে গেছে।

এসব খুনসুটি যখন চলছেই তখন অফিসের ফোন- এই অনলাইনে কিছু দিবেন? অনুষ্ঠানে কতজন এলো। আমি বললাম- আমিসহ ৭জন এসেছেন, ব্যাপক আলোচনা চলছে, তবে কোন নিউজ নাই। সেসময় সাদা জামদানি পরে, ঘুম না হওয়া চোখে হাজির হলেন রোকসানা কবীর (ছদ্মনাম)। তাকে অভ্যর্থনা জানিয়ে উঠে দাড়ানো একজন প্রায় এলিয়ে পড়ে বললেন- তোমার শাড়িটা না- একেবারে হৃদয় বিদারক।

রোকসানা কবীর তখন বুঝাতে থাকলেন সাদা কেন তার প্রিয়, এই রংকে হদয়বিদারক হিসেবে দাড় করানোর পিছনে অন্য রাজনীতি আছে। এটা নিয়ে বেশ কয়েকজন কথা চালিয়ে গেল। ততোক্ষণে সব মিলে ৪০মিনিট পার হয়েছে।

এসময় অর্থ মন্ত্রনালয়ের জেণ্ডার ফোকাল পয়েন্ট এক নারী কর্মকর্তা রুমে ঢুকতেই আয়োজকদের ভিতর একজন বললেন, এতো সুন্দর সুন্দর মুখগুলো হারিয়ে ছিল, আমাদের ভুলে ছিল কি করে এতোদিন? কতোদিন পর দেখলাম। মনে হচ্ছে খালি আড্ডাই দিই। অনুষ্ঠান শুরু করতে হবে ভাবলেই মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে।

আর সেই কর্মকর্তা নারী বলে উঠলেন, ‘আমি ভাল বাসি যারে, সেকি আমা হতে কভু দুরে যেতে পারে?’

..আর বাকিরা চায়ের কাপ এদিক ওদিক রেখে হাততালি দিয়ে উঠল।

এবার মূল আলোচনা এই কর্মকর্তার আবৃত্তি প্রতিভা নিয়েই।

ব্যক্তি-১: ওমা আপনি আবৃত্তি করেন?
ব্যক্তি-২: বুঝাই যাচ্ছে চর্চার ভিতরই আছেন..নাহলে চট করে পরিস্থিতির সাথে মিলিয়ে বললেন কি করে

আবৃত্তিকার সেই জেণ্ডার কর্মকর্তা: হুম..আমি নিয়মিত উপস্থাপনাও করি…

ব্যক্তি-১: তাহলে একটা পুরো আবৃত্তি হয়ে যাক…সবার ঘুমঘুম চোখগুলো আড়মোড়া ভাঙুক।

তারপর শুর’ হল একের পর কবিতা পাঠ..রবীন্দ্র নজর’ল। চলছেই। তারে থামায় কার সাধ্যি। ‘সাম্যের গান গাই, আমার চক্ষে পুরুষ রমণী কোন ভেদাভেদ নাই/ বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি, চিরকল্যানকর… আওড়াতে আওড়াতে যখন অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধে তার নর’ লাইনটা এলো তখন দেখা গেলো সমস্বরে দলীয় আবৃত্তি শুর’ হলো।

এরপর রবীন্দ্রনাথের প্রশ্ন কবিতার শুরু-
ভগবান, তুমি যুগে যুগে দূত পাঠায়েছ বারে বারে
দয়াহীন সংসারে
তারা বলে গেল `ক্ষমা করো সবে’, বলে গেল `ভালোবাসো—
অন্তর হতে বিদ্বেষবিষ নাশো’।
বরণীয় তারা, স্মরণীয় তার, তবুও বাহির-দ্বারে
আজি দুর্দিনে ফিরানু তাদের ব্যর্থ নমস্কারে॥

এভাবে একের পর এক আবৃত্তি চলতে চলতে ১২টা বেজে আসলো। কারোর কোনটা কমন পড়লেই সেই দলীয় আবৃত্তিই চললো। ততোক্ষণে একে একে জড়ো হতে হতে আমরা দুজন সাংবাদিকসহ ২০জন ব্যক্তি উপস্থিত হলো।

অনেক নারী সংসদ সদস্য একজায়গায় হবেন বলেই অফিস আমাদের পাঠিয়েছিলেন, নাহলে হয়তো একটা অভিজ্ঞতাময় সকাল পেতাম না। কিন্তু মাত্র একজন হাজির হলেন। আর কেউই এলেন না। তখন মূল বিষয় থেকে সরে সংসদ সদস্যদের হাজির না হওয়া নিয়েই আলাপ আলোচনা চলতে থাকলো। একসময় সেই অর্থমন্ত্রনালয়ের কর্মকর্তা বলেই ফেললেন- ‘আমার মনে হয় সংসদ সদস্যরা নারীনীতি নিয়ে সচেতনতা তৈরি বিষয়ে আগ্রহী নন। এই আলাপ করে কি পকেটে একটা টাকাও আসবে? এমনিতেই তাদের কাজের কোন সুনির্দিস্ট এলাকা, অর্থ বরাদ্দ তেমন নাই। এসব সচেতনতা বিষয়ে কথা বলতে গেলে কপালে মাইর আছে বলেই তারা বিশ্বাস করেন।”

এরপর সোয়া একটা পযন্ত আলাপ করা হলো নিজেদের বিষয়ে- নারী নীতি বাস্তবায়ন নিয়ে কোন আলাপ সেদিন আর হলো না। আমরা খেয়ে দেয়ে ফিরে এলাম। তবে হ্যা, একটা কথা না বললেই না, দুপুরে ওরা খেতে দিয়েছিল ভাল। ‘রাগটা তখন পড়েই গেল’- সাদা ভাত, ঘন মুগডাল, নিরামিশ, দেশী মুরগীর মাংস, সালাদ। সকালে না খেয়ে বের হয়ে খুব ক্ষতি হয়নি, ভালো করে খাওয়া গেলো।

Advertisements

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s