Home

আপনারা কি জানতে চান তুবা গ্রুপের অনশনকারী শ্রকিরা কেমন আছে? জানতে চান, তুবা গ্রুপের আন্দোলনের পরে কি হল?

গত বছর রোজার ঈদের দিন থেকে তুবা গ্রুপের (তাজরীন ফ্যাশন্স লি. এই গ্রুপেরই একটি কারখানা) ১৬০০ শ্রমিক অনশন আন্দোলন শুরু করে। তাদের দাবী তিন মাসের বকেয়া বেতন ও ঈদ বোনাস। আন্দোলনের চাপে সরকার-বিজিএমইএ-মালিকপক্ষ শ্রমিকদের দুইমাসের বেতন দিতে বাধ্য হন। একই সঙ্গে শ্রমিকদের বেতনের দাবীকে অজুহাত হিসেবে ব্যাবহার করে মালিক জামিন আদায় করে। তিনমাসের বেতন বঞ্চিত শ্রমিকের বঞ্চনার জীবন পরিণত হয় মালিকশ্রেণীর টাকার খেলা। লোক দেখানো মামলা হল শ্রম আদলতে, সরকারই উদ্যোগ নিয়ে মামলা করল। সেই মামলার আজ পর্যন্ত এক চুলও অগ্রগতি হয়নি। শ্রমিকদের এক মাসের বেতন ও ঈদ বোনাস এখনও তুবা গ্রুপের মালিক ও কর্তৃপক্ষের পকেটস্থ।

মালিক বেতনের দাবীর আন্দোলনকে কারণ হিসেবে দেখিয়ে কারখানা বন্ধ করার ঘোষণা দিল। কাগজে পত্রে বন্ধ, কিন্তু বাস্তবে কারখানা চলছে। আন্দোলনকারী শ্রমিকদের ছাটাই করে নতুন শ্রমিকদের নিয়ে মালিকের ব্যাবসা-বাণিজ্য করার চেষ্টা করছে। ভালোই চলছে। সম্প্রতি নিম্ন আদালতে তাকে আদালতে টাকার আদান-প্রদান করতে দেখা গিয়েছে।

আন্দোলনকারী শ্রমিকদের অনেকে অন্য কারখানায় কাজ পেয়েছে। যারা পায়নি, তাদের কেউ বাধ্য হয়ে বাসা-বাড়িতে কাজ নিয়েছে। কেউ তীব্র ক্ষোভে শ্রমিক সংগঠনে বাকি জীবন কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

তোবা গ্রুপ শ্রমিকদের বকেয়া বেতন আদায়ের আন্দোলন চলাকলে একটি সংবাদ সম্মেলনের আমরা বাংলাদেশের শ্রম আইনের একটি বিশ্লেষণ উপস্থপন করেছিলাম। পরবর্তীতে বিশ্লেষণটিকে পরিবর্ধিত করি। বাংলাদেশে মালিকশ্রেণীর শ্রম আইন লঙ্ঘনের ইতিহাস পাঠে লেখাটি প্রাসঙ্গিক। প্রতিপক্ষের প্রকৃত স্বরূপ ও শোষণের হাতিয়ার চিনে নেয়া জরুরী। তাই লেখাটি নিয়ে আবারও হাজির হলাম।

মে দিবস দিচ্ছে ডাক, মালিক শ্রেণী নিপাত যাক

– শহিদুল ইসলাম সবুজ

আলোকচিত্র: এন্ড্রু বিরাজ

আলোকচিত্র: এন্ড্রু বিরাজ

একজন গার্মেন্টস মালিক ও চাকরীচ্যূত ১৬০০ শ্রমিক

বাংলাদেশের ইতিহাসে শ্রম আইনটি কেবল মালিকদের স্বার্থ রক্ষা, বিদশী বায়ারদের মনোরঞ্জন বা জিএসপির সুবিধা পাওয়ার জন্য ব্যাবহৃত হয়ে আসছে।  শ্রমিকস্বার্থ সংশ্লিষ্ট যে সামান্য কয়েকটি ধারা আছে তার প্রয়োগ কখনও করতে দেখা যায়নি। শ্রম আইন বাস্তবে শ্রমিকের বিপক্ষেই ব্যাবহার করা হয়। তাই শ্রমিকদের জীবনে এই আইনটি মালিকপক্ষের ক্ষমতা র্চচার দলিল ছাড়া আর কিছুই নয়।  আমরা আইনের এই একচোখা প্রয়োগ দখেইে অভ্যস্ত। তোবা গ্রুপ, তথা তাজরীন ফ্যাশন্স লিমিটিডের মালিক, মো. দেলোয়ার হোসেনের শ্রম আইন লঙ্ঘনের উদাহরণগুলোর দিকে তাকালেই স্পষ্ট হয় কেন শ্রমিকদের চোখে বিদ্যমান শ্রম আইনকে মালিকশ্রেনীর ক্ষমতা চর্চার অস্ত্র।

তোবা গ্রুপের একটি কারখানা, তাজরীন ফ্যাশন্স লিমিটিডে দুই বছর আগে এক ভয়াবহ অগ্নিকা-ে ১১৯জনের অধিক শ্রমিক নিহত হন।  শ্রম আইনের দ্বিতীয় অধ্যায়ের ১৯ ধারা অনুযায়ী মৃত শ্রমিকরা চাকুরীর মজুরী পাবেন। এই আইনে বলা হয়েছে, ”যদি কোন শ্রমিক কোন মালিকের অধীন অবিচ্ছিন্নভাবে অন্তত ২বছরের অধিক কাল চাকুরীরত থাকা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন, তাহা হইলে মালিক মৃত শ্রমিকের কোন মনোনীত ব্যক্তি বা মনোনীত ব্যক্তির অবর্তমানে তাহার কোন পোষ্যকে  তাহার প্রত্যেক পূর্ণ বছর বা উহার ৬ মাসের অধিক সময় চাকুরীর জন্য ক্ষতিপূরণ হিসেবে ৩০ দিনের …প্রদেয় হইবে।”  কিন্তু তাজরীন অগ্নিকা-ে নিহত একজন শ্রমিককেও শ্রম আইন অনুযায়ী পাওনা টাকা বুঝিয়ে দেয়া হয় নি। গ্রাচ্যুইটি, সেভারেন্স পে ইত্যাদিতো দূরের কথা, যে মাসে কারখানায় আগুন লেগেছিল সে মাসের পাওনা বেতনাটাও স্বজনদের দেয়া হয়নি। মৃত শ্রমিকের পাওনা আত্মসাতের শাস্তির বিধানও শ্রম আইনে রয়েছে। তার প্রয়োগ অবশ্য কখনই দেখা যায়নি।

এবারে সরাসরি তোবা গ্রুপের কথা বলি। আপনারা জানেন, এই রোজার ঈদে তোবা গ্রুপের ৫টি কারখানার প্রায় ১৬০০ শ্রমিক তিন মাসের বকেয়া বেতন ও বোনাসের দাবীতে আমরণ অনশন আন্দোলন করতে বাধ্য হয়েছিল। আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে, ২০১৩ সালের  ঈদুল-ফিতরের আগেও শ্রমকিদরে অবস্থান ধর্মঘট করে বেতন আদায় করতে হয়েছে। অথচ শ্রম আইনের নবম অধ্যায়ের (কর্মঘন্টা ও ছুটি) অধীনে ১১৯ ধারা মোতাবেক ছুটির আগে শ্রমিকের প্রদেয় বুঝিয়ে দেয়া কারখানা কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। কিন্তু তোবা গ্রুপের মালিক ও কারখানা কর্তৃপক্ষ বরাবরই এই ধারা লঙ্ঘন করে আসছে। এ বিষয়ে কারখানা পরিদর্শক অধিদপ্তরকে কোনও আইনি পদক্ষেপ নিতে আমরা দেখিনি।

আন্দোলন চলাকালে, শ্রমিকদের পাওনা বুঝিয়ে দেয়ার শর্তে তোবা গ্রুপের মালিকের জামিন মঞ্জুর করা হল। মালিক জেলখানা থেকে বেরিয়ে আসার পর কিছু পাওনা পরিশোধ করলেন, তারপর পাওনা মজুরী আদায়ের সংগ্রামকে অবৈধ আখ্যা দিয়ে সবকটি কারখানা বন্ধ ঘোষণা করলেন। বিগত মে মাস থেকে শ্রমকিরা নিয়মতান্ত্রিকভাবে কারখানা কর্তৃপক্ষের সাথে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বেতন আদায়ের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু বিজিএমইএ ও কারখানা কর্তৃপক্ষ তাদের কথা ও চুক্তির বরখেলাপ করার কারণেই শ্রমিকগণ অনশনের পথ বেছে নেন। এই আন্দোলন, ধর্মঘটকে অবৈধ আখ্যা দিয়ে মালিক কারখানা বন্ধ করে দিয়েছে। শুধু তাই নয়, অকস্মাত বিনা নোটিশে ফ্যাক্টরি বন্ধ করলে শ্রম আইন অনুযায়ী শ্রমিকের যে পাওনা তা পরিশোধ করতেও অস্বীকার করছেন।  শ্রম আইনের দ্বিতীয় অধ্যায়ের (নিয়োগ ও চাকুরীর শর্তাবলী) অধীনে ২৬ নং ধারার ৩ ও ৪ অনুচ্ছেদে বর্নিত বিধি বিধানে বলা হয়েছে,”যে ক্ষেত্রে মালিক বিনা নোটিশে কোন শ্রমিকের চাকুরীর অবসান করিতে চাহেন সে ক্ষেত্রে প্রদেয় নোটিশের পরিবর্তে নোটিশ মেয়াদের জন্য মজুরী প্রদান করিয়া ইহা করিতে পারিবেন।… [অসমাপ্ত]।” কিন্তু তোবা গ্রপের মালিক উপরোক্ত আইন অবলীলায় উপেক্ষা করেছেন।

এই পাঁচটি কারখানা বন্ধ ঘোষণা করলেও, মালিক জামিনে মুক্ত হলে তোবা গ্রুপের অন্য কারখানাগুলো পূর্ণ উদ্যমে আবার চালু হয়। পুরানো শ্রমিকরা নতুন করে চালু হওয়া কারখানায় চাকরির জন্য গেলে তাদের অকথ্য গালাগাল করে ভাগিয়ে দেয়া হয়। তাদের অপরাধ, তারা বেতনের দাবীতে আন্দোলন করেছে। কারখানা মালিক, মো. দেলোয়ার হোসেন এক সাক্ষাৎকারে দম্ভ করে বলেছেন সে ”[গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরামের সভাপ্রধান মোশরেফা] মিশুর শ্রমিক”দের অর্থাৎ আন্দোলনরত শ্রমিকদের কাজ দেবে না (প্রথম আলো, ৪ নভেম্বর ২০১৪)। আন্দোলনের চাপে শ্রমিকদের বেতন আত্মসাত করতে না পারার ক্ষোভেই হয়তো মালিকের এই ক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়া! শ্রম আইনের ১৯৫ ধারা অনুযায়ী মালিকের এহেন উক্তি ও আচরণ অসৎ শ্রম আচরণ হিসেবে বিবেচিত হবে। এই ধারায় সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে, ”[কোন মালিক] যদি কোন শ্রমিক, কোন ট্রেড ইউনিয়নে সদস্য আছেন, এই অজুহাতে তাহাকে চাকরীতে নিয়োজিত করতে বা রাখিতে অস্বীকার করিবেন না, [যদি করেন, তাহলে তা মালিকের অসৎ শ্রম আচরণ হিসেবে বিবেচিত হবে]।” অসদাচারী ও শতাধিক শ্রমিক হত্যার দায়ে অভিযুক্ত মালিক আয়েশে ঘুরে বেড়ায়, আর চাকরীচ্যুত ১৬০০ শ্রমিক অসহায় মানবেতর জীবন যাপন করছে। এই কি আইনের বিধান? তাই যদি হয়, তাহলে এই শ্রম আইনকে মালিকের ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ বলা কি ভুল বলা হবে?

শ্রম আইনের প্রতি সবচেয়ে অশ্রদ্ধাশীল আচরণ আমরা এদেশের গার্মেন্টস মালিকদেরই করতে দেখি। কিছুদিন আগে মিরপুরস্থ হামীম সোয়েটার কারখানাটি বিনা নোটিশে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ধানম-ির ওয়েগার ফ্যাশন্সের কর্তৃপক্ষ কারখানা ভবন স্থানান্তরের অজুহাতে কয়েকশত শ্রমিকের পাওনা না বুঝিয়ে দিয়েই কারখানা বন্ধ করে দিয়েছে। বাড্ডার টোপাজ গার্মেন্টস আর লালবাগের সিপিএল গার্মেন্টসেও একই ঘটনা। এই মুহূর্তে বেতন বকেয়া বুঝিয়ে না দিয়ে গার্মেন্টস কারখানা আকস্মিক বন্ধ করার বিরূদ্ধে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতৃত্বে কয়েক হাজার শ্রমিক আন্দোলন করছে। গার্মেন্টস মালিকগণ মনে করেন তারা সকল আইনের উর্ধ্বে। মালিক শ্রেণীর আইন অমান্য করার সংস্কৃতি, টাকা দিয়ে আইন কিনে নেয়া দিনের অবসান কি ঘটবে না?

অনেক দেরীতে হলেও তোবা গ্রুপের মালিকের বিরুদ্ধে সরকার আইনি পদক্ষেপ নিয়েছেন। শ্রম আইনের দশম অধ্যায়ের ১২৩ (মজুরী পরিশোধের সময়) ধারার অধীনে উল্লেখিত একাধিক উপধারা লঙ্ঘনের অপরাধে সরকারের পক্ষ থেকে একজন শ্রম পরিচালক শ্রম আদালতে মামলা দায়ের করেছেন। শ্রম আইনের ৩০৩ ও ৩০৭ ধারা অনুযায়ী দায়ের করা মামলায় সময় মতন শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধ না করার অভিযোগে মালিক দেলোয়ারের ৬ মাসের কারাদন্ডের বিধান রয়েছে। আমরা আশা করছি, সররকার বা মালিকপক্ষ আইনি প্রক্রিয়াকে অজুহাত হিসেবে ব্যাবহার করে তোবা গ্রুপের শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধ করতে দীর্ঘসূত্রীতার পথ বেছে নেবে না।  শ্রমিকদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গিয়েছে। তাঁরা বলছেন, ”আমাদের প্রাপ্য না বুঝিয়ে দিলে আমরা রাজপথ ছাড়ব না। এ আমাদের ঘাম-রক্ত জল করা টাকা, এ টাকা আত্মসাত করে যে অট্টালিকা তা আমরা ভাঙ্গবোই।”

সরকার ও মালিকপক্ষ মুনাফার অট্টালিকা ভাঙ্গার শব্দ না পেলেও আমরা রাজনৈতিক কর্মীরা দেয়ালে হাতুড়ীর আঘাতের শব্দ ঠিকই শুনতে পাই।

Advertisements

One thought on “একজন গার্মেন্টস মালিক ও চাকরীচ্যূত ১৬০০ শ্রমিক

  1. Pingback: Tejgaon: The Fire This Time | Shunyastan

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s