Home
Photo courtesy: Mahmudul Sumon

Photo courtesy: Mahmudul Sumon

নাজনীন শিফা, সায়দিয়া গুলরুখ ও মাহমুুদুল সুমন

সাম্প্রতিক সময়ে পোশাক শিল্পে শ্রমিকের ট্রেড ইউনিয়নের অধিকারের বিষয়টি অনেক বেশি আলোচনায় আসছে। তাজরিন অগ্নিকান্ড পরবর্তী গবেষণা কাজে যুক্ততার কারণে গত দু’বছরে একাধিকবার বিভিন্ন দেশের ট্রেড ইউনিয়ন প্রতিনিধিদের সাথে আমাদের আলোচনার সুযোগ হয়েছে। খুব সম্প্রতি একজন জার্মান ট্রেড ইউনিয়ন প্রতিনিধির সাথে আলোচনায় তিনি বলছিলেন ”বাংলাদেশের ট্রেড ইউনিয়ন বোঝা বেশ জটিল”। এ থেকে যে প্রশ্নটি মনে জাগে তা হলো জার্মানীর ট্রেড ইউনিয়নের বাস্তবতা বোঝা কি আমাদের জন্য খুব সহজ বিষয়? আসলে পশ্চিমা দেশের ট্রেড ইউনিয়নের ইতিহাস ও এগিয়ে চলা এবং এই অঞ্চলের ট্রেড ইউনিয়ন ও তার বেড়ে ওঠা ঐতিহাসিকভাবেই খুব ভিন্ন। কিন্তু ট্রেড ইউনিয়ন সংক্রান্ত আলোচনার বৈশ্বিক প্রেক্ষিতে বিষয়টি অনুল্লেখিত বলেই মনে হয়। বাংলাদেশে গার্মেন্টস সেক্টরের সাম্প্রতিক বিভিন্ন উদ্যোগ থেকে যে প্রশ্নগুলো জরুরী বলে মনে করি তা হলো: বানিজ্যের বৈশ্বিকীকরণের সাথে সাথে ট্রেড ইউনিয়নেরও কি বৈশ্বিকীকরণ প্রয়োজন? যদি ট্রেড ইউনিয়নের বৈশ্বিকীকরনের প্রয়োজন হয়, তার চেহারাটা কী বা কী হওয়া দরকার?

বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পক্ষেত্রে ট্রেড ইউনিয়নেরর চেহারা অন্যান্য শিল্পক্ষেত্রের ট্রেড ইউনিয়নের চাইতে কিছুটা ভিন্ন। এখানে গার্মেন্টস শিল্পক্ষেত্রে ট্রেড ইউনিয়ন কখনোই একটি নির্দিষ্ট গতিতে চলতে পারেনি। মুক্তবাজার বানিজ্যের চাপ, বিশ্ব ব্যাংকের স্ট্রাকচারাল অ্যাডজাস্টমেন্ট প্রোগ্রামের আওতাধীন নানা পরামর্শ এবং ট্রেড ইউনিয়ন মুক্ত ইপিজেড গঠনের প্রেসক্রিপশান ইত্যাদি কারণে আশির দশকের মাঝামঝি থেকে আজ পর্যন্ত গার্মেন্টস সেক্টরে ট্রেড ইউনিয়নকে প্রতিহত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত। একটি দ্রুতবিকাশমান শিল্পের বিকাশের পাশাপাশি কিভাবে এই শিল্প সেক্টরকে অবাধ বানিজ্য ও মুনাফার জন্য প্রসারিত রাখা যায়, কিভাবে শ্রমআন্দোলনমুক্ত রাখা যায়, কিভাবে ট্রেড ইউনিয়নমুক্ত রাখা যায় এবং কিভাবে দেশীয় ট্রেড ইউনিয়ন গুলোকে দুর্বল করে ফেলা যায়, সেই প্রচেষ্টাই একটা দীর্ঘ সময় ধরে আমরা সমুন্নত থাকতে দেখেছি। তাই বলে এই সেক্টরে শ্রমিকের প্রতি চরম অবহেলা, নির্যাতন, নিপীড়ন এবং এর বিরুদ্ধে শ্রমিকের প্রতিরোধ কখনোই থেমে ছিলনা।

বাংলাদেশে গার্মেন্টস শিল্প বিকাশের প্রাথমিক পর্যায়ে ট্রেড ইউনিয়নের কাজকে নানাভাবে বাঁধাগ্রস্ত করা হলেও সাম্প্রতিক সময়ে আমরা দেখতে পাই হঠাৎ করে এই শিল্পে ট্রেড ইউনিয়নের সংখ্যা খুব দ্রুত গতিতে বাড়ছে। এক হিসাবে ২০১৩ এর জুলাই থেকে ২০১৪ এর ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোট ৯৬টি ট্রেড ইউনিয়নের রেজিস্ট্রেশন হয়েছে, যেখানে এর আগের ২ বছরে মাত্র ২টি ট্রেড ইউনিয়নের রেজিস্ট্রেশন হয়েছে। হঠাৎ বেড়ে যাওয়া এই সংখ্যা কি দৈবাৎ কোন ঘটনা, নাকি এর পেছনে কোন কারণ রয়েছে? বাংলাদেশে গার্মেন্টস শিল্পে অবহেলাজনিত একের পর এক “দুর্ঘটনায়” ট্রেড ইউনিয়নের অনুপস্থিতিকে একটি বড় কারণ হিসেবে বিশ্লেষকেরা মনে করেন। যেন ট্রেড ইউনিয়ন করতে পারলেই এই ধরনের ঘটনা ঘটতনা। তাই এর সমাধানে বিভিন্ন উদ্যোগের পাশাপাশি শ্রমিকের ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার বাড়ানোর উপর জোরারোপ করা হয়েছে, যার পেছনে রয়েছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শ্রম অধিকার সংস্থাসমূহের চাপ। এই উদ্যোগসমূহ ভাল বা খারাপ সেটা বিশ্লেষণের সময় এখনো হয়নি। কিন্তু দ্রুত ট্রেড ইউনিয়নের সংখ্যা বাড়িয়ে তোলার যে উদ্যোগ তা অনেকাংশে এঅঞ্চলের ট্রেড ইউনিয়নের ইতিহাস, বিভিন্ন সময়ের নীতিগত পরিবর্তন এবং বর্তমান প্রেক্ষিতকে গুরুত্ব না দিয়েই নেয়া হচ্ছে । গবেষক হিসেবে আমাদের প্রশ্ন এইধরনের উদ্যোগ আসলে কতটুকু শ্রমিকের সাথে জীবন ঘনিষ্ট, নাকি এসকল উদ্যোগ শুধু গার্মেন্টস শিল্পকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা নানা অর্থনৈতিক ও সামাজিক পুঁজির স্বার্থ রক্ষা করবে?

শ্রমিকের ট্রেড ইউনিয়ন করার বাস্তবতা কী সেটাও বোঝা জরুরী। সাধারন অর্থে আট ঘন্টা কাজের পর ঘন্টা প্রতি বাড়তি মূল্যে যে শ্রম দেয়া হয় তাকে ওভারটাইম বলে। ওভারটাইম বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পে শ্রমিকের জন্য একটি নিত্যদিনের বাস্তবতা। এটা শ্রমিকের জন্য বেতনের পর বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি করে ঠিকই, কিন্তু এই ওভারটাইম করা বা না করা শ্রমিকের ইচ্ছার উপর নির্ভর করেনা। এটা অনেকটা বাধ্যতামূলক শ্রমের মত। সেই কারণে গার্মেন্টস শিল্পে শ্রমিকের সুনির্দিষ্ট কর্মঘন্টা বলে কিছু নেই। ১২-১৬ ঘন্টা কাজের পর ইউনিয়ন করার মত সময় বা সুযোগ কতটুকু সেই বাস্তবতাও বোঝা জরুরী। উপরন্তু এই শিল্পে আশি শতাংশের বেশি নারী শ্রমিক যারা কাজ থেকে ঘরে ফিরে আরেক দফা কাজের জগতে যুক্ত হয়ে পড়েন, ট্রেড ইউনিয়নের কাজে সময় দেয়ার সুযোগ তাদের জন্য আরো কম। নারী শ্রমিকদের সাথে আলাপচারিতায় প্রায়শই শোনা যায়, যারা কিনা প্রতিবাদী, যাদের মধ্যে ট্রেড ইউনিয়নিজিম বা প্রতিবাদী ধরনের সত্তা আছে তাদেরকে ম্যানেজমেন্টের দিক থেকে ভাল চোখে দেখা হয়না। কাজ পেতেও অসুবিধা হয়। এই বিষয়গুলো বিবেচনা করলে ট্রেড ইউনিয়নের যে আদর্শ মডেল, ফ্যাক্টরী ভিত্তিক ইউনিয়ন এবং তার ভিত্তিতে ফেডারেশন গড়ে তোলা, তা আসলে কতটুকু সম্ভব? বাংলাদেশে ট্রেড ইউনিয়নের ক্ষেত্রে এই সকল বাস্তবতাকে বিবেচনায় নেয়া হয় না বলেই আমাদের মনে হয়।

বাংলাদেশে গার্মেন্টস শিল্পের বিকাশের পুরোটা সময় জুড়ে দেশীয় ট্রেড ইউনিয়নগুলো যেমন নানা বাঁধা বিপত্তির মধ্যে কাজ করেছে, পাশাপাশি আমরা দেখেছি উন্নয়ন সংস্থা কেন্দ্রিক নানা তৎপরতার বিকাশ। এই উন্নয়ন সংস্থা/ বিদেশী সাহায্য নির্ভর তৎপরতাকে আরো “অথেনটিক” প্রতীয়মান করা এবং শ্রমিকের লড়াই-সংগ্রামে শ্রমিকের অগ্রগামী ভূমিকার প্রয়োজনীয়তা থেকে আরেকটি প্রজন্মের এনজিও তৎপরতা আমরা দেখতে পাই যাদের ভূমিকা একইসাথে এনজিও এবং ট্রেড ইউনিয়নের মত। এই সংস্থাগুলো বিদেশী দাতা গোষ্ঠীর সহায়তায় পরিচালিত যারা প্রশ্নহীন ভাবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শ্রমবিষয়ক নীতির দেশীয় বাস্তবায়কের ভূমিকায় অবতীর্ন। আপাত দৃষ্টিতে এই ধরনের সংগঠনগুলোকে মনে হয় আন্তর্জাতিক গার্মেন্টস বানিজ্যের দরকষাকষিতে দেশীয় ট্রেড ইউনিয়নের চাইতে দক্ষ। তাছাড়া এই সকল সংগঠনের প্রধানদের শ্রমিক হিসেবে এই সেক্টরে যুক্ত থাকার ইতিহাস তাদেরকে বিভিন্ন মহলে আরো বেশি গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে।

আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরে মাঠকর্মের ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি এই ধরনের একাধিক সংগঠন সেখানে কাজ করে। তারা নিশ্চিন্তপুরে শ্রমিকদেরকে সংগঠিত করে শ্রমিকদের মধ্য থেকে তাদের নিজেদের পক্ষের লোক তৈরি করে, বিভিন্ন কর্মসূচিতে আসার জন্য টাকা প্রদান করে। বিশেষ করে তাজরিন অগ্নিকান্ডের পরবর্তী সময়ে বায়ারদের নিকট থেকে বিরাট অংকের ক্ষতিপূরণ পাইয়ে দেয়ার কথা বলেও শ্রমিকদের মাঝে কাজ করে চলেছে। তাজরিন অগ্নিকান্ডের পরবর্তী সময়ে আমরা দেখেছি এইরকম একটি সংগঠন শতাধিক শ্রমিককে পুড়িয়ে মারার প্রতিবাদে শ্রমিককে সংগঠিত না করে নিশ্চিন্তপুরে শ্রমিকদের মাঝে টয়লেট, কম্বল, গুড়ো দুধের মত ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করতে। শ্রমিকদেরকে তাদের অধিকারের লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সংগঠিত না করে এভাবে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে যে এই সকল শ্রমিক সংগঠনগুলোর সরাসরি স্বার্থ যুক্ত রয়েছে তা স্পষ্ট। এইসকল সংগঠনের বৈদেশিক আর্থিক অনুদান পাওয়ার ক্ষেত্রে অন্যতম যোগ্যতা হলো বিভিন্ন দিবসে মানব বন্ধন বা সমাবেশে শ্রমিকদেরকে একত্রিত করা এবং দাবী দাওয়া পেশ করা। এই ধরনের প্রক্রিয়ার কারণে এই সংগঠন গুলোর পক্ষে যে কোন কর্মসূচিতেই অনেক লোক জড়ো করে ফেলা সম্ভব এবং যেকোন দরকষাকষিতে তাদের এই বিরাট সংখ্যক শ্রমিককে ব্যবহার করাও সম্ভব। শ্রমিকদেরকে ব্যবহার করা হয় একারনে বলছি যে, এই ধরনের কর্মসূচিতে আসা শ্রমিকদের অনেকেই জানে না তারা সেখানে কেন এসেছেন, শুধু বাসভর্তি করে তাদের নিয়ে আসা হয়েছে এপর্যন্তই তারা জানেন।

এই কারণেই স্থানীয় ট্রেড ইউনিয়ন বা শ্রমিক সংগঠনগুলোর জন্য ক্রমশই কঠিন হয়ে পড়ছে শ্রমিকদের সংগঠিত করবার কাজ। বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করার সুবাদে দেখেছি এটা এখন স্থানীয় শ্রমিক সংগঠনের জন্য একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ যা মোকাবেলার কোন কৌশল তাদের হাতে নেই। শ্রমিকরা দেখে যে এই ধরনের সংগঠনের ডাকে গেলে টাকা পয়সা কিছু পাওয়া যায়, আর স্থানীয় শ্রমিক সংগঠনের কর্মসূচিতে খালি হাতে ফিরে আসতে হয়। এই নব্য ধারার এনজিও/ ডোনার/ বায়ারের দেয়া শ্রম আন্দোলনের মডেল এতই শক্তিশালী যে, খুব সম্প্রতি স্থানীয় একটি ট্রেড ইউনিয়নকে দেখেছি ঈদের সময় চাঁদা তুলে শ্রমিকদের মাঝে সেমাই কেনার জন্য টাকা বিতরণ করতে। আমরা এখানে স্পষ্ট দেখতে পাই কিভাবে শ্রমিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের মধ্যকার সম্পর্ক দ্রুতই সংহতি ও সহযোদ্ধার পরিবর্তে পেট্রন-ক্লায়েন্ট সম্পর্কে পরিণত হচ্ছে। এই নতুন ধারার ট্রেড ইউনিয়ন শ্রম সম্পর্কে বা গার্মেন্টস শিল্পের চলমান অবস্থায় কী পরিবর্তন আনতে পারবে সে সম্পর্কে আমরা সন্দিহান।

(এই লেখাটির একটি সংক্ষিপ্ত রূপ দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল ২৪শে নভেম্বর ২০১৪)

Advertisements

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s