Home
Photo courtesy: Activist Anthropologist

Photo courtesy: Activist Anthropologist

নাফিসা তানজীম

[গত কয়েক বছরে তাজরীন অগ্নিকান্ড ও রানা প্লাজা ধসের কারণে আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের পোশাক কারখানাসমূহের কাজের পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে বাংলাদেশের কারখানাগুলোতে পোশাক উৎপাদন করা কর্পোরেশানগুলো নিজেদের ব্র্যান্ড ইমেজ রক্ষার ব্যাপারে সচেতন হয়ে ওঠে। এর প্রেক্ষিতে ২০১৩ সালে “অ্যাকর্ড ফর বিল্ডিং সেফটি ইন বাংলাদেশ” ও “অ্যালায়েন্স ফর বাংলাদেশ ওয়ার্কার সেফটি” নামে দুটো কর্পোরেট কোড আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হয়। বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের ইতিহাসে কর্পোরেট কোড অফ কন্ডাক্ট প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন নতুন কিছু নয়। অতীতে বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষিতে বেশ কয়েকবার এধরণের কর্পোরেট কোড গৃহীত ও বাস্তবায়িত হয়েছে এবং এই কোডগুলো দেশীয় ও আন্তর্জাতিক নানা মহলে আলোচিত ও সমালোচিত হয়েছে।

কর্পোরেট কোড অফ কন্ডাক্টের সমস্যা ও সম্ভাবনাগুলো কী কী? এই ধরণের কোড কাদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়? শ্রমিকের জীবন ও কাজের পরিবেশের বস্তুগত পরিবর্তন আনতে কর্পোরেট কোড কতখানি ভূমিকা রাখতে পারে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে বাংলাদেশের শ্রমিকের জীবন ও কাজের মান উন্নয়নের লক্ষ্যে নব্বইয়ের দশকে হার্কিন বিল পরবর্তী সময়ে গৃহীত একটি মেমোরান্ডাম অফ আন্ডারস্ট্যান্ডিং এবং একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকে প্রণীত অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের উদাহরণ বিশ্লেষণ করে কর্পোরেটকেন্দ্রিক বিভিন্ন শ্রম অধিকার বিষয়ক উদ্যোগের সীমাবদ্ধতা এবং এর পেছনে কাজ করা বিভিন্ন ধরণের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক চালিকাশক্তির স্বরুপ উন্মোচন করতে হার্কিন বিল থেকে অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সঃ কর্পোরেটকেন্দ্রিক শ্র্ম অধিকার বিষয়ক উদ্যোগের সীমাবদ্ধতা এই বিষয়ে নাফিসা তানজীমের ধারাবাহিক লেখার দ্বিতীয় পর্ব]

২০১৪ সালের মে মাসের ২৩ তারিখে “অ্যার্কড ফর বিল্ডিং অ্যান্ড সেফটি ইন বাংলাদেশ” (সংক্ষেপে “বাংলাদেশ অ্যাকর্ড”) আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হয়। প্রাথমিকভাবে ক্লিন ক্লথ ক্যাপ্লেইন ও ম্যাকুইলা সলিডারিটি নেটওয়ার্ক নামে দুইটি আন্তর্জাতিক ইউনিয়ন, বাংলাদেশের চারটি ইউনিয়ন ফেডারেশান এবং ৪০ টিরও বেশি কর্পোরেশান এই অ্যাকর্ডে স্বাক্ষর করে। চারটি শ্রম অধিকার সংগঠন অ্যাকর্ড স্বাক্ষরের প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে উপস্থিত ছিলো। অ্যাকর্ড স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ ইন্সপেকশান, শ্রমিক স্বাস্থ্য, কাজের পরিবেশ ও ক্ষমতায়ন নিশ্চিতকরণ, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা ঝুঁকি রোধে আর্থিক সহায়তা প্রদান এবং প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থ হলে কর্পোরেশানকে দায়ী করার উদ্যোগ নেয়। জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল, আইএলও এবং অর্গানাইজেশান ফর ইকনমিক কোঅপারেশানসহ আরো বেশ কিছু সংগঠন অ্যাকর্ডের উদ্যোগকে স্বাগত জানান। স্বাক্ষর করা কর্পোরেশানগুলো বাংলাদেশে অগ্নি এবং ইমারত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য পাঁচ বছর মেয়াদী উদ্যোগ নেবে। যে কর্পোরেশানগুলো অ্যাকর্ডে স্বাক্ষর করেছে তাদের বেশিরভাগই ইউরোপিয়ান ব্র্যান্ড। এই ব্যান্ডগুলোর মধ্যে রয়েছে বেনেটন, এইচ অ্যান্ড এম, ইস্পিরিট, যারা, মার্কস অ্যান্ড স্পেন্সার ইত্যাদি। আইএলওর তত্ত্বাবধানে অ্যাকর্ডটি বাস্তবায়িত হবে (ক্লিন ক্লথ ক্যাম্পেইন ও ম্যাকুইলা সলিডারিটি নেটওয়ার্ক ২০১৩, ১)।

মূলবক্তব্যঃ

বাংলাদেশ অ্যাকর্ডের মোট ২৫ টি ধারা আছে। এই ধারাগুলোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলোঃ

– বর্তমানে প্রচলিত কোম্পানি নিয়ন্ত্রিত কারখানার মনিটরিং ব্যবস্থা্র নানা ধরণের দুর্বলতা আছে। বাংলাদেশ সরকারও শ্রম আইন বাস্তবায়নে এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য সফলতা দেখাতে পারেনি। এই প্রেক্ষিতে অ্যাকর্ড একজন নিরপেক্ষ ইন্সপেক্টরকে কারখানা পরিদর্শনের দায়িত্ব দেবে।

– পরিদর্শনের ফলাফল ও পরবর্তী কর্ম পরিকল্পনা সর্বসাধারণের জন্য প্রকাশ করা হবে। এতে করে কারখানাগুলোর ওপর কাজের পরিবেশের উন্নয়নের জন্য চাপ তৈরি হবে।

– উৎপাদনের ক্ষমতা অনুযায়ী ফ্যাক্টরিগুলোকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম ও দ্বিতীয় টায়ারের কারখানাগুলোতে সম্পূর্ণ ইন্সপেকশান ও ট্রেনিং প্রোগ্রাম চালু করা হবে। তৃতীয় টায়ারের কারখানাগুলোতে পূর্ণ ইন্সপেকশান করা হবে কিন্তু কোন ট্রেনিং প্রদান করা হবে না।

– স্টিয়ারিং কমিটি শ্রমিক ও ম্যানেজারদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাবিষয়ক ট্রেনিং প্রদানের জন্য একজন ট্রেনিং কোঅর্ডিনেটর নিয়োগ করবে। এই উদ্যোগে বাংলাদেশের ট্রেড ইউনিয়নগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে।

– শ্রমিকরা যাতে কোন ধরণের ভয়-ভীতি ছাড়া অনিরাপদ কর্মপরিবেশে কাজ করতে অসম্মতি প্রকাশ করতে পারে তা নিশ্চিত করা হবে। – কারখানাগুলোতে শ্রমিক ও ম্যানেজমেন্টের সমন্বয়ে যুগ্ম স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা বিষয়ক কমিটি গঠন করা হবে। এই কমিটি বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী কাজ করবে।

– বায়াররা পণ্যের এমন কোন দাম নির্ধারণ করতে পারবে না যা চিফ ইন্সপেক্টরের সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য কারখানাগুলোর পর্যাপ্ত অর্থ বিনিয়োগকে অসম্ভব করে তুলবে।

– সংস্কারকাজ পরিচালনার জন্য যদি কোন কারখানা বন্ধ হয়ে যায়, তবে কোম্পানিগুলো সাপ্লায়ারকে পরবর্তী ছয় মাস শ্রমিকদের চাকরি বহাল রাখতে ও বেতন দিতে বাধ্য করবে। যদি কোন ফ্যাক্টরি কর্মপরিবেশ পরিবর্তন করতে ব্যর্থ হওয়ার কারণে বন্ধ হয়ে যায়, তবে কোম্পানিগুলো শ্রমিকদের অন্য কোন ভালো পরিবেশের কারখানায় কাজ খুঁজতে যৌক্তিকভাবে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সাহায্য করবে।

– ইন্সপেকশান প্রোগ্রাম পরিচালনার জন্য যে স্টিয়ারিং কমিটি গঠন করা হবে, সেখানে শ্রমবিষয়ক সংগঠন এবং কোম্পানিসমূহ সমানভাবে প্রতিনিধিত্ব করবে।

– আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক সালিশের মডেলে একটি আইনগত মতবিরোধ নিরসনের প্রক্রিয়া গঠন করা হবে। কোন মতবিরোধ হলে প্রথমে স্টিয়ারিং কমিটি সেটি নিরসনের চেষ্টা করবে। স্টিয়ারিং কমিটি ব্যর্থ হলে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আইন কমিশনের নীতি অনুযায়ী আইনানুগ সালিশ হবে। সালিশের সিদ্ধান্ত কোর্ট বা যথাযথ আইনপ্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হবে (ক্লিন ক্লথ ক্যাম্পেইন ও ম্যাকুইলা সলিডারিটি নেটওয়ার্ক ২০১৩, ৪-৬)।

অ্যাকর্ড ফর বিল্ডিং অ্যান্ড সেফটি ইন বাংলাদেশ-এর বৈশিষ্ট্যঃ

অন্যান্য কর্পোরেট কোড অফ কন্ডাক্ট থেকে বাংলাদেশ অ্যাকোর্ড বিভিন্ন দিক থেকে আলাদা। যেমনঃ

– বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের বাইরের বিভিন্ন শ্রম অধিকার সংগঠন এবং ট্রেড ইউনিয়নসহ বায়ার, সাপ্লায়ার ও সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধিবৃন্দ অ্যাকর্ড প্রণয়ণের নানা পর্যায়ে অংশগ্রহণ করেন। কর্পোরেট কোড অফ কন্ডাক্টের ক্ষেত্রে এমনটি সচরাচর দেখা যায় না।

– কর্পোরেট কোড অফ কন্ডাক্ট বাস্তবায়ন করতে কর্পোরেশানগুলো আইনগতভাবে বাধ্য থাকে না। কিন্তু বাংলাদেশ অ্যাকর্ড কর্পোরেশানগুলোকে কারখানায় নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে আইনগতভাবে বাধ্য করে।

– কোম্পানির কোড অফ কন্ডাক্টের যে অনিয়ন্ত্রিত ধারাটি অনেকদিন ধরে চলে এসেছে, সেটি বাংলাদেশের কারখানাগুলোর কাজের পরিবেশের পরিবর্তন ঘটাতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। বাংলাদেশ অ্যাকর্ড একজন নিরপেক্ষ ইন্সপেক্টরকে কারখানা নিরীক্ষণের দায়িত্ব দেয়। তাই আশা করা হচ্ছে যে এটি পূর্বের চেয়ে অনেক বেশি বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ নিরীক্ষণ নিশ্চিত করবে।

– অনেকসময় বায়াররা নিরাপত্তাজনিত কারণে অর্ডার বাতিল করে দেন। কিন্তু তারা ইন্সপেকশানের রিপোর্ট প্রকাশ না করায় কারখানাগুলো নিরাপত্তা পরিস্থিতির কোন পরিবর্তন না এনে উৎপাদন চালিয়ে যেতে পারে। অ্যাকর্ডের ধারা অনুযায়ী ইন্সপেক্টর সবধরণের ইন্সপেকশানের রিপোর্ট জনসমক্ষে প্রকাশ করতে বাধ্য থাকবেন।

– কোম্পানিগুলো চাইলেই নিরাপত্তা পরিস্থিতির দোহাই দিয়ে অর্ডার বাতিল করে দায় এড়াতে পারবে না। তারা প্রথম ও দ্বিতীয় টায়ারের কারখানাগুলোতে কমপক্ষে পরবর্তী দুই বছর কাজের অর্ডার দিতে বাধ্য থাকবে (ক্লিন ক্লথ ক্যাম্পেইন ও ম্যাকুইলা সলিডারিটি নেটওয়ার্ক ২০১৩, ৪-৬)।

সীমাবদ্ধতাঃ

গতানুগতিক কর্পোরেট কোড অফ কন্ডাক্ট থেকে কিছুটা আলাদা হলেও বাংলাদেশ অ্যাকর্ড কারখানার কর্মপরিবেশের উন্নয়নের জন্য কোন ম্যাজিক বুলেট হিসেবে কাজ করবে না। অ্যাকর্ড প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নের বিভিন্ন পর্যায়ে কোম্পানি ও ইউনিয়নের পারষ্পরিক সহযোগিতার কথা বার বার বলা হলেও অ্যাকর্ড অনেকক্ষেত্রে কোম্পানির স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দেয়। নিচে অ্যাকর্ডের বিভিন্ন ধারা সম্পর্কে শ্রম আন্দোলনের কর্মী ও মানবাধিকার সংগঠনসমূহ যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তা আলোচনা করা হলো।

বাংলাদেশের প্রচলিত শ্রম আইন কারখানার অবস্থা পরিবর্তনের জন্য যথেষ্ট নয় – এটি ধরে নিয়ে অ্যাকর্ডের উদ্যোক্তারা একটি প্রাইভেট আইনপ্রয়োগকারী কাঠামো গড়ে তুলছেন। রাষ্ট্রের শ্রম আইন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে কীভাবে আরো দক্ষ ও কার্যকর করে তোলা যায় সেটি অ্যাকর্ডের বিবেচ্য বিষয় নয়।

অ্যাকর্ড প্রণয়নের বিভিন্ন পর্যায়ে সরকারের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণের আশঙ্কাজনক অভাব দেখা গেছে। ক্লিন ক্লথ ক্যাম্পেইন ও ম্যাকুইলা সলিডারিটি নেটওয়ার্কের রিপোর্ট অনুযায়ী ২০১০ সালে অ্যাকর্ড প্রণয়নের প্রারম্ভিক পর্যায়ের একটি মিটিং-এ বায়ার, পোশাক কারখানা, ট্রেড ইউনিয়ন ও শ্রম অধিকার সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকলেও বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে কেউই অংশ নেননি। ২০১১ সালে “দ্যাটস ইট স্পোর্টস ওয়্যার” কারখানাসহ আরো কয়েকটি কারখানায় অগ্নিকান্ডের পর এপ্রিল মাসে ঢাকায় বাংলাদেশী ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইউনিয়ন, এনজিও, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও রিটেইলার এবং বিজিএমইএর একটি মিটিং অনুষ্ঠিত হয়। এই মিটিং-এ বাংলাদেশের সরকারের পক্ষ থেকে ফায়ার সেফটি ডিপার্টমেন্ট এবং বিল্ডিং ও ফ্যাক্টরি ডিপার্টমেন্টের প্রতিনিধিগণ অংশগ্রহণ করেন। কিন্তু সরকারের শ্রম মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন নীতি নির্ধারক মহলকে অ্যাকর্ড ড্রাফটের বিভিন্ন পর্যায়ে অংশ নিতে ততটা দেখা যায় নি।

বাংলাদেশের ৫০০০-এরও বেশি পোশাক কারখানাকে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় – এই তিনটি টায়ারে ভাগ করা হয়। এদেশের শতকরা প্রায় ৮০ ভাগ কারখানা তৃতীয় টায়ারের মধ্যে পড়ে। তৃতীয় টায়ারের কারখানাগুলোয় সাধারণত ৫০ এর কম সংখ্যক কর্মী দিয়ে ৮টি প্রোডাকশান লাইনে সর্বনিম্ন প্রযুক্তির সহায়তায় পোশাক তৈরি করা হয়। এদের বেশিরভাগ সাব-কন্ট্রাকটর হিসেবে কাজ করে। অর্থাৎ এরা অন্যান্য মাঝারি বা বড় আকারের স্থানীয় কারখানার কাছ থেকে কাজের অর্ডার নেয়। আন্তর্জাতিক বায়ারদের সাথে তৃতীয় টায়ারের কারখানাগুলোর কোন সরাসরি যোগাযোগ নেই। এই কারখানাগুলোর গড়পরতা কাজের পরিবেশ প্রথম ও দ্বিতীয় টায়ারের কারখানার চেয়ে অনেক নিম্নমানের হয়। কাজের জন্য উন্নতমানের পরিবেশ রক্ষার পেছনেকম অর্থব্যয় করতে হয় বলে প্রথম ও দ্বিতীয় টায়ারের কারখানার উৎপাদন খরচের চেয়ে তৃতীয় টায়ারের উৎপাদন খরচ প্রায় ২৫% শতাংশ কম (বিয়ারনট)।অ্যাকর্ড প্রথম ও দ্বিতীয় টায়ারের কারখানাগুলোতে পূর্ণ ইন্সপেকশান ও ট্রেনিং প্রোগ্রাম চালু করবে। তৃতীয় টায়ারের কারখানাগুলোতে শুধু ইন্সপেকশান করা হবে; কোন ধরণের ট্রেনিং দেয়া হবে না। অথচ তৃতীয় টায়ারের এই কারখানাগুলো সাব-কন্ট্রাক্টের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বায়ারদের চাহিদার বিশাল অংশ পূরণ করে থাকে (ক্লিন ক্লথ ক্যাম্পেইন ও ম্যাকুইলা সলিডারিটি নেটওয়ার্ক, ৫)।

অ্যাকর্ড অনুযায়ী যেসব কারখানাকে সংস্কার প্রকল্পের আওতায় আনা হবে তাদের পূর্ণ তালিকা জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হবে। কিন্তু যে বায়াররা এই কারখানাগুলোতে উৎপাদন করছিলো, তাদের নাম প্রকাশ করা হবে না (ক্লিন ক্লথ ক্যাম্পেইন ও ম্যাকুইলা সলিডারিটি নেটওয়ার্ক, ৫)। অ্যাকর্ড অনুযায়ী বায়ারদেরকে তাদের সাব-কন্ট্রাক্টরদের তালিকা প্রকাশ করতে হবে। কিন্তু বায়ারদের প্রকাশিত তথ্য সঠিক কিনা তা যাচাই করার কিংবা কোন দুর্ঘটনার সময় আইনগত দায়বদ্ধতা কে বহন করবে তা নির্ধারণ করার জন্য কোন সুস্পষ্ট দিক নির্দেশনা অ্যাকর্ডে নেই (বিয়ারনট)।

কোন কারখানা ইন্সপেকশান, সংস্কার বা ট্রেনিং প্রোগাম চালু করার ব্যাপারে যথাযথ সহযোগিতা করতে না পারলে নোটিশ এবং ওয়ার্নিং দেয়া হবে। এর পরেও কাজ না হলে কারখানাটি বন্ধ করে দেয়া হবে (মারিয়ান ২০১৩)। অ্যাকর্ড অনুযায়ী কোন কারখানা চাইলে সংস্কারের জন্য প্রয়োজনীর অর্থের বিকল্প উৎস, যেমন – যুগ্ম বিনিয়োগ, ঋণ, সরকারি বা দাতাদের সহযোগিতা ইত্যাদিঅনুসন্ধান করতে পারে (ক্লিন ক্লথ ক্যাম্পেইন ও ম্যাকুইলা সলিডারিটি নেটওয়ার্ক, ৫)। কিন্তু অ্যাকর্ড ব্র্যান্ডগুলোকে কারখানা সংস্কারের খরচ বহনের দায়িত্ব থেকে পুরোপুরি অব্যাহতি দিয়েছে। অ্যাকর্ডে স্বাক্ষর করা ব্র্যান্ডগুলো প্রতি বছর স্টিয়ারিং কমিটি, সেফটি ইন্সপেক্টর ও ট্রেনিং কো-অর্ডিনেটরের জন্য ৫০০,০০০ মার্কিন ডলার প্রদান করবে। কিন্তু কারখানার কর্মপরিবেশের উন্নয়নের জন্য কোন ধরণের আর্থিক সহায়তা প্রদানে বা আর্থিক সহায়তার উৎস খোঁজায় সাহায্য করতে তারা বাধ্য নয়।

অ্যাকর্ডে বলা হয়েছে স্বাক্ষরকারী কোম্পানিগুলো প্রথম ও দ্বিতীয় টায়ারের কারখানাগুলোতে পরবর্তী দুই বছর কাজের অর্ডার দিবে। কিন্তু কোম্পানিগুলো নিঃশর্তভাবে অর্ডার বহাল রাখতে বাধ্য নয়। তারা ততক্ষণ পর্যন্তই কাজের অর্ডার দেবে যতক্ষণ কারখানাগুলো অ্যাকর্ড অনুযায়ী নিজেদের করণীয় কর্তব্যসমূহ সঠিকভাবে পালন করবে এবং পুরো প্রক্রিয়াটি অর্ডারকারী কোম্পানির জন্য লাভজনক হবে (ক্লিন ক্লথ ক্যাম্পেইন ও ম্যাকুইলা সলিডারিটি নেটওয়ার্ক, ৫-৬)। অ্যাকর্ড অনুযায়ী যদি কারখানা সংস্কারকাজের জন্য সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়, তবে পরবর্তী ছয় মাস সাপ্লায়াররা কারখানার কর্মীদের চাকরি ও বেতন বহাল রাখতে বাধ্য থাকবে (ক্লিন ক্লথ ক্যাম্পেইন ও ম্যাকুইলা সলিডারিটি নেটওয়ার্ক, ৬)। চাকরি ও বেতন বহাল রাখার খরচ বহন করবে সাপ্লায়ার, কোম্পানি নয়। সংস্কার কাজে ছয় মাসের বেশি সময় লাগলে কী ব্যবস্থা নেয়া হবে, সে ব্যাপারে অ্যাকর্ডে পরিষ্কার করে কিছু বলা নেই। অ্যাকর্ডে আরো বলা হয়েছে যে কর্মপরিবেশ পরিবর্তনে ব্যর্থ হওয়ার জন্য যদি কোন কারখানা বন্ধ হয়ে যায়, তবে কোম্পানি পোশাককর্মীদের অন্য কারখানায় কাজ খোঁজার ব্যাপারে “যৌক্তিক”ভাবে (reasonable) সাহায্য করতে চেষ্টা করবে (ক্লিন ক্লথ ক্যাম্পেইন ও ম্যাকুইলা সলিডারিটি নেটওয়ার্ক, ৬)। কতখানি চেষ্টা করা যৌক্তিক, সেটি ঠিক করবে স্বাক্ষরকারী কোম্পানি। যেসব ক্ষেত্রে একটি কারখানায় অনেকগুলো কোম্পানি উৎপাদন করে, সেসব ক্ষেত্রে কীভাবে কোম্পানিগুলো নিজেদের মাঝে শ্রমিকদের সাহায্য করার দায়িত্বটি ভাগ করে নেবে তা পরিষ্কার নয় (ব্যারি ২০১৩)।

“বাংলাদেশ ফায়ার অ্যান্ড বিল্ডিং সেফটি অ্যাকর্ড” (BFBSA) নামে ২০১২ সালের একটি চুক্তির অনেকগুলো ধারা অ্যাকর্ডে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। BFBSA তে এনজিওরা স্বাক্ষরকারী হিসেবে অংশগ্রহণ করে। কিন্তু ২০১৩ সালে এনজিওদের প্রত্যক্ষদর্শীর ভূমিকায় রেখে পুরো অ্যাকর্ডটি স্বাক্ষরিত হয় ট্রেড ইউনিয়ন ও কোম্পানিদের মধ্যে। BFBSA কোম্পানিকে প্রস্তাবিত শর্ত বাস্তবায়নের জন্য দুই বছর সময় দিলেও কোম্পানিদের অনুরোধে অ্যাকর্ডে এই সময়সীমা দুই বছর থেকে বাড়িয়ে পাঁচ বছর করা হয়(ক্লিন ক্লথ ক্যাম্পেইন ও ম্যাকুইলা সলিডারিটি নেটওয়ার্ক, ৬)।

কোম্পানি কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত মনিটরিং-এ কোম্পানি নিজের ইচ্ছামত নিয়ম-কানুন ও মানদন্ড নির্ধারণ করে। একারণে এধরণের মনিটরিং-এ স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধতা এবং শ্রমিক ও ট্রেড ইউনিয়নের অংশগ্রহণের অভাব থাকে। ক্লিন ক্লথ ক্যাম্পেইন ও ম্যাকুইলা সলিডারিটি নেটওয়ার্কের রিপোর্টে বলা হয় যে কোম্পানি নিয়ন্ত্রিত মনিটরিং ব্যবস্থা চরমভাবে ব্যর্থ হওয়ার কারণে অ্যাকর্ডের উদ্যোগটি নেয়া হয়। কিন্তু অ্যাকর্ড কোম্পানি নিয়ন্ত্রিত মনিটরিং-এর ব্যবস্থাকে পুরোপুরি বাতিল করে দিচ্ছে না। অ্যাকর্ডে বলা হয়েছে, যদি কোম্পানির ইন্সপেকশান অ্যাকর্ডের মানদন্ড মেনে চললে নিরপেক্ষ সেফটি ইন্সপেক্টর কোম্পানির ইন্সপেকশানের রিপোর্ট গ্রহণ করতে পারবেন (ক্লিন ক্লথ ক্যাম্পেইন ও ম্যাকুইলা সলিডারিটি নেটওয়ার্ক, ৬)।

বাংলাদেশ অ্যাকর্ডটি শুধু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কিন্তু বাংলাদেশে যে ধরণের শিল্প দুর্যোগ ঘটে থাকে, সে ধরণের দুর্যোগ পাকিস্তান, ভারত, কম্বোডিয়াসহ আরো অনেক দেশেই ঘটেছে। সুতরাং বৈশ্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই অ্যার্কডটির প্রভাব অত্যন্ত গৌণ।ভারতের ব্যাঙ্গালরে শ্রমিক নিরাপত্তাবিষয়ক অ্যাক্টিভিস্ট রাশমি ভেঙ্কাটাসেনের মতে, বায়ারদের অবশ্যই তাদের সাপ্লাই চেইনে শ্রমিকদের মানবাধিকার রক্ষার জন্য এগিয়ে আসতে হবে। তবে যেসব কারখানা স্থানীয় বা অপেক্ষাকৃত কম বিখ্যাত আঞ্চলিক পরিবেশকের জন্য কাজ করে, অ্যাকর্ডের মত চুক্তিগুলো সেসব কারখানার কর্মপরিবেশের উন্নয়নে কোন ভূমিকা রাখে না (মরের ২০১৩)।

কোন কোম্পানি বাংলাদেশ অ্যাকর্ডের মানদন্ড মেনে চলতে না চাইলে তাকে অ্যাকর্ড মানতে বাধ্য করার কোন পদ্ধতি নেই। আবার যেসব কোম্পানি বাংলাদেশে কখনো উৎপাদন করেনি, তারা চাইলে বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে অন্য কোন দেশে উৎপাদন করতে পারে যেখানে অ্যাকর্ডে উল্লিখিত শর্ত রক্ষার ব্যাপারে কোন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ চাপ নেই। পিটার মারিয়ানের রিপোর্ট অনুযায়ী নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন মন্তব্য করেছেন যে বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান দুর্নীতির প্রেক্ষিতে অ্যাকর্ড সফল হবে কি হবে না তা অনেকটাই একেকটি কারখানা ও সংগঠনের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করবে (মারিয়ান ২০১৩)।

(চলবে)

তথ্যসূত্র

Barrie, Leonie. “Bangladesh Safety Accord Still Raises Questions.”, last modified 15 May 2013, accessed 31 May 2014, http://www.just-style.com/comment/bangladesh-safety-accord-still-raises-many-questions_id117852.aspx.

Bearnot, Edward. “Bangladesh: A Labor Paradox.” World Policy Institute, accessed 11 March, 2014, http://www.worldpolicy.org/journal/fall2013/Bangladesh-Labor-Paradox.

Brooks, Ethel. 2007. “Children, Schools, and Labored Questions.” In Unraveling the Garment Industry: Transnational Organizing and Women’s Work, 1-25. Minnesota: University of Minnesota Press.

Clean Clothes Campaign and Maquila Solidarity Network. “The History Behind the Bangladesh Fire and Safety Accord.”, last modified 8 July 2013, accessed 2 June 2014, https://www.google.com/url?sa=t&rct=j&q=&esrc=s&source=web&cd=2&cad=rja&uact=8&ved=0CDEQFjAB&url=http%3A%2F%2Fwww.cleanclothes.org%2Fresources%2Fbackground%2Fhistory-bangladesh-safety-accord%2Fat_download%2Ffile&ei=Xa6LU7yMO9iQuATqjICIDg&usg=AFQjCNFB6Bsmin9h2w3vTQ-1rTdNPqOREA&sig2=6gYl6biySR8bQJQ_-Qaj8w.

Dhaka Tribune. 16 May 2014. “Accord Under Fire for Not Paying Jobless RMG Workers.” Dhaka Tribune.

Greenhouse, Steven. “Europeans Fault American Safety Effort in Bangladesh.” New York Times., last modified 18 November 2013, accessed 31 May 2014,http://www.nytimes.com/2013/11/19/business/international/europeans-fault-american-safety-effort-in-bangladesh.html?_r=0.

Gunther, Marc. “GAP Spearheads New Alliance for Bangladeshi Worker Safety.” The Guardian, last modified 11 July 2013, accessed 31 May 2014,http://www.theguardian.com/sustainable-business/gap-alliance-bangladeshi-worker-safety.

Klein, Naomi. 2000. No Logo. Canada: Vintage.

Marian, Petah. “What does the New Bangladesh Safety Accord Entail?”, last modified 14 May 2013, accessed 31 May 2014, http://www.just-style.com/comment/what-does-the-new-bangladesh-safety-accord-entail_id117835.aspx.

Maurer, Roy. “Public, Private Sectors Take Action to Improve Worker Safety in Bangladesh.”, last modified 29 August 2013, accessed 31 May 2014,http://www.shrm.org/hrdisciplines/safetysecurity/articles/pages/worker-safety-bangladesh.aspx.

McCauley, Lauren. “Critics Blast US Retailers’ Corporate-Dominated Factory Safety “Sham”.” Common Dreams, last modified 11 July 2013, accessed 31 May 2014,http://www.commondreams.org/headline/2013/07/11-0.

Ovi, Ibrahim Hossain. 2014a. “Accord & Alliance to Meet Buet Engineers Tomorrow to Solve Disputes.” Dhaka Tribune, 14 May 2014.

———. 2014b. “Accord and Buet Close to Consensus.” Dhaka Tribune, 16 May 2014.

———. 2014c. “Accord Flouts Deal to Skip Remediation Expenses.” Dhaka Tribune, 6 May 2014.

Shayon, Sheila. “US Retailers Detail Implementation of Controversial Bangladesh Safety Plan.” Brand Channel, last modified 21 August 2013, accessed 31 May 2014,
http://www.brandchannel.com/home/post/2013/08/21/US-Bangladesh-Safety-Plan-Implementation-082113.aspx.

নাফিসা তানজীম, পিএইচডি গবেষক, রাটগার্স বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাষ্ট্র

Advertisements

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s