Home
কল্পনা চাকমা অপহরণের বিচার হবে কি?
২৪ জুলাই, ১৯৯৬, দৈনিক ভোরের কাগজ

২৪ জুলাই, ১৯৯৬, দৈনিক ভোরের কাগজ

সঞ্চয় চাকমা, অতিথি ব্লগার

১৯৯৬ সালের ১২ই জুন। সে রাতে পাহাড়ী গণ পরিষদের তৎকালীন নেতা ও পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের অন্যতম পৃষ্টপোষক মি. বিজয় কেতন চাকমার বাড়িতে ঘুমিয়েছিলাম। ভোরে ঘুম থেকে উঠেছিলাম মাত্র। তখনও ঘুম ঘুম ভাব কাটেনি। এমন সময় বাঘাইছড়ি থেকে ফোন আসল। তখন আজকের মতন উন্নত টেলিযোগাযোগ ছিল না। কোনও রকমে এই খবরটুকু দিতে সক্ষম হল যে, গত রাতে (১১জুন) কল্পনা চাকমাকে কজইছড়ি আর্মি ক্যাম্পের অধিনায়ক লে. ফেরদৌস এবং তার দলবল নিজ বাড়ি থেকে চোখ বেধে নিয়ে গিয়েছে। খবরটা শোনার পরপরই আমাদের সবার মাথায় যেন বিনা মেঘে বজ্রপাত। আমরাতো এ ধরনের খবরের জন্য অপেক্ষা করিনি। উপস্থিত সকলে হতভম্ব হয়ে গেলাম। আমরা সবাই প্রস্তুত ছিলা ১২ই জুনের জাতীয় নির্বাচনের হাল-চাল নিয়ে খবরাখবর শুনার। একী খবর শুনলাম আমরা?

খবরটা পাওয়ার সাথে সাথে আমরা ঢাকায় উর্ধবতন কর্তৃপক্ষের কাছে জানিয়ে দিলাম। তাছাড়া আমাদের পরিচিত-অপরিচিত সাংবাদিক মহলে খবরটা দিলাম। এছাড়া জাতীয় ও আর্ন্তজাতিক মানবাধিকার সংস্থার কাছেও অপহরণের খবরটা জানানো হয়েছিল। যোগাযোগ ব্যাবস্থা উন্নত না হওয়ার কারণে সেদিন এর থেকে বেশি কিছু করা আর সম্ভব হয়নি। নির্বাচনী ব্যস্ততার মাঝেও সারাদিন কল্পনার ভাগ্য নিয়েই ভাবছিলাম। আমি খুব তাড়াতাড়ি ঢাকায় ফিরে আসলাম। প্রতিবাদ কর্মসূচীর পাশাপাশি মানবাধিকার কর্মী, সাংবাদিক মহলে ব্যপক প্রচার, যোগাযোগ করতে থাকলাম। ঢাকা, চট্টগ্রাম থেকে আমাদের সংগ্রামের প্রতি সহানুভুতিশীল কিছু সাংবাদিক সরেজমিন তদন্তে করতে উদ্বুদ্ধ করা হল। অবশেষে কল্পনা অপহরণের খবরটা জাতীয় দৈনিকসহ বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ছাপা হল। পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ, পাহাড়ী গণ পরিষদ ও হিল উইমেন্স ফেডারেশনের উদ্যোগে কল্পনা চাকমাকে উদ্ধারের দাবীতে পালিত হল সারা পার্বত্য চট্টগ্রামসহ, ঢাকা ও চট্টগ্রামে পালিত হল অসংখ্য প্রতিবাদ কর্মসূচী। বাঘাইছড়িতে পালিত হল অবরোধ কর্মসূচী। সেই অবরোধ কর্মসূচীকে ভন্ডুল করার জন্য সেনা-সেটলার মিলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাঁধালো। বাঘাইছড়ির বাবুপাড়ায় নিহত হল তৎকালীন পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের আপোষহীন কর্মী সমর, সুকেষ ও মনোতোষ। আহত হল অনেকে।

স্বতন্ত্র প্রার্থী বিজয় কেতন চাকমা নির্বাচনে হেরে গিয়েছিলেন। তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। কারণ স্থানীয় প্রশাসনসহ সারা বাংলাদেশের প্রশাসন ছিল আওয়ামী লীগের পক্ষে। তাই আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসল। বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপ্রধান শেখ মুজিবর রহমানকে হত্যার পর এই প্রথম আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসল। সবাই মনে করল, দেশের আপামর জনগণ এবং দেশের সংখ্যালঘুদের জন্য কিছু করবে। যথারীতি পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সাথে পূর্ববর্তী সরকারের চালিয়ে যাওয়া সংলাপ অব্যাহত থাকল। কিন্তু নির্বাচনের মাত্র কয়েক ঘন্টা পূর্বে অপহৃত পার্বত্য চট্টগ্রামের আপোষহীন নেত্রী কল্পনা চাকমা অপহরণ নিয়ে একের এক নাটক সাজিয়ে যেতে থাকল। অপহরণ ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার জন্য বাংলাদেশ সেনা বাহিনীর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চট্টগ্রাম ডিভিশন কমান্ডার জি.ও.সির মাধ্যমে নানা টালবাহানা করতে থাকল। এমনও প্রচার করেছিল যে, তৎকালীন শান্তিবাহিনী কল্পনা চাকমাকে ধরে নিয়ে ভারতের ত্রিপুরায় আটকে রেখে এসেছে। এছাড়া আরও কত মিথ্যা প্রচারের মাধ্যমে অপহরণ ঘটনাকে ভিন্ন পথে পরিচালনের ফন্দি-ফিকির করল। কিন্তু আসল জায়গায় হাত দিল না। অর্থাৎ অভিযুক্ত লে. ফেরদৌসকে গ্রেফÍার কিংবা বা শাস্তির বিষয়ে কিছুই করল না। কাজেই বুঝার আর কিছুই বাকি রইল না যে, কল্পনা চাকমা অপহরণ বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে চলমান রাষ্টীয় সহিংসতার একটি অংশ মাত্র।

সবচেয়ে মজার বিষয় হল, ১৯৯৬ সালে সেই নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগ সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সাথে চলমান সংলাপের এক পর্যায়ে ১৯৯৭সালের ২রা ডিসেম্বর ’পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি’ স্বাক্ষর করল। এই চুক্তিটি পরে শান্তি চুক্তি নামে পরিচিতি পেল। কল্পনা চাকমা অপহরণের মতন ঘটনাসহ পার্বত্য চট্রগ্রামে সংঘটিত কোনও হত্যাকান্ড ও অন্যায়ের বিচার নিশ্চিত না করে একটি ত্বড়িত, যেনতেন চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে সরকার আসলে জুম্ম জনগণের প্রতিরোধ শক্তিকেই ধ্বংস করার চেষ্টা করেছে। জুম্ম জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা মোটেই সরকারের উদ্দেশ্য ছিল না। পাহাড়ের তিনটি সংগঠন (পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ, পাহাড়ী গণ পরিষদ ও হিল উইমেন্স ফেডারেশন) যে সংগঠনগুলোতে কল্পনা চাকমা নিরলস কাজ করে গিয়েছেন এই প্রতারণামূলক চুক্তিকে প্রত্যাখ্যান করেছে।

বলাই বাহুল্য জুম্ম জনগণের প্রতিরোধ শক্তির মূলেই ছিল শান্তি বাহীনি, যারা বাংলাদেশ রাষ্ট্রোর ধরাছোয়ার বাইরে থেকে জুম্ম জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পাহাড়ে সশস্ত্র সংগ্রাম চালিয়ে আসছিলেন। এই সংগ্রামের মূল উপাদান ছিল অস্ত্র। সরকার অস্ত্র কেড়ে নেয়া ও জুম্ম জনগণের আন্দোলনকে নখদন্তহীন করার কৌশল হিসেবে এই চুক্তি করে। এবং সফল হয়। এই চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী জনাব সন্ত লারমা সম্প্রতি নিজে এই কথা স্বীকার করেছেন। ১৮ বছর পরে এই চুক্তিযে সরকারের এক প্রতারণা দিবালোকের মতন পরিষ্কার। কল্পনা অপহরণ মামলা সেই থেকে আজ পর্যন্ত রাঙামাটি আদালতে দায়সারাভাবে চলছে।

এতো গেল জুম্ম জনগণকে দমনের সরকারের কৌশল ও চুক্তির কথা। আরও কিছু কথা অবশ্যই বলতে হয়, আজকে বলতে চাই। আজ যে সব পাহাড়ী ও বাঙালী সংগঠন এবং তাদের কর্মীবৃন্দ কল্পনা চাকমা অপহরণ নিয়ে মায়া কান্না কাঁদছে কিংবা কান্নায় ভেঙ্গে পড়ছে, সে সব সংগঠন ও তাদের কর্মী বৃন্দরা কল্পনা চাকমা ও তার আর্দশ বিরোধী। কল্পনা চাকমার কণ্ঠ সামারিক বাহিনীর সদস্যকে প্রশ্নবানে জর্জরিত করতে এক মুহূর্ত দ্বিধা করেনি। কল্পনা সকল ধরনের সুবিধাবাদ, লোক দেখানো প্রতিবাদ, তোষামোদিতা, আপোষকামিতার বিরোধিতা করত। জুম্ম জনগণের সংহতি ছিল তার জীবনের পাথেয়। কোনও হীন শক্তি তাকে এক চুল সরাতে পারেনি তার আদর্শ থেকে। সে কারণেই বাঘাইছড়ির মতন পশ্চাদপদ প্রত্যন্ত এলাকায় থেকেও নিজেকে পাবর্ত্য চট্রগ্রামসহ, বাংলাদেশের অধিকারহারা মানুষদের একজন আপোষহীন নেত্রী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছেন। কিন্তু দূঃখের বিষয় হল, আজকে বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন ও মানবাধিকার এনজিওগুলো কল্পনা চাকমার অপহরণকে পাব্যর্ত চট্্রগ্রামের সংগ্রাম থেকে, তথা কল্পনার সংগ্রাম থেকে বিচ্ছিন্নভাবেই একটি ইস্যু হিসেবে দেখে। অতিরঞ্জিত হবে কিনা জানি না, তবে এই ধরনের উদ্যোগ দেখলে মনে হয় কল্পনার সংগ্রাম যেন বিদেশে সভা-সমিতিতে যাওয়ার বা পাব্যর্ত নারী ইস্যুতে কনসালটেন্সির সুযোগের নাম। এখন এমন এক সময় দূঃখ, দারিদ্র, সংগ্রামের কথা, এমনকি অপহরণের মতন ঘটনাও বিভৎস ব্যবসায় পরিণত হয়েছে।

কল্পনা অপহরণের দিনের কথা স্মরণ করতে গিয়ে অনেক কথা লিখলাম। অনেক কথা মনে পড়ল।

সবশেষে এই কথাটা বলা যায় যে, কল্পনা চাকমা অপহরণ এবং তার পরবর্তীতে পাহাড়ে ঘটে যাওয়া নারীর প্রতি সহিংসতা, জুম্ম এলাকায় অগ্নি সংযোগ, বিজিবি-সেনা-আনসার কর্তৃক ভূমি দখলের ঘটনা জুম্ম জনগণের অস্তিত্বের উপর চলমান আঘাতের এই সরকারি নীতিমালায় বদল না এনে কোনও চুক্তি বাস্তবায়ন সম্ভব না। জুম্ম জনগণের প্রতিরোধ শক্তিকে ধ্বংস ও জুম্ম জনগণের ঐক্যকে আঘাত করার নীতি কায়েম রেখে কল্পনার সংগ্রাম বাস্তবায়িত করা যাবে না। জুম্ম জাতীয় ঐক্য সব কিছুর মূল ভিত্তি।

সঞ্চয় চাকমা, কল্পনা চাকমার ঘনিষ্ট সহযোদ্ধা এবং দুই যুগের অধিক কাল পার্বত্য চতগ্রামের রাজনৈতিক সংগ্রামে নানা মাত্রায় যুক্ত ছিলেন , বর্তমানে সুইজার ল্যান্ড-এ বসবাস করছেন 

Advertisements

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s