Home

নাসরিন সিরাজ

পহেলা বৈশাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় উৎসব জমায়েতে উপস্থিত কয়েকজন সাধারণ নারী নাগরিকের ওপর ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের কর্মীদের দ্বারা সংগঠিত যৌননিপীড়নের ঘটনায় যখন ঢাকা ও ঢাকার বাইরে বাংলাদেশের শিক্ষিত ও স্বচ্ছল নাগরিক সমাজের অনেকে প্রতিবাদ করছে, দোষী ব্যক্তিদের গ্রেফতার দাবী করছে এবং অপরাধী ধরতে পুলিশ/প্রশাসনের ব্যর্থতা নিয়ে বিক্ষোভ প্রকাশ করছে ঠিক তখন বাংলাদেশের নাগরিকদের নিয়ে আরেকটি ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের সংবাদ আমরা পাই। ৮ মে ২০১৫ প্রথমআলোর খবরে প্রকাশ :

“থাইল্যান্ডের শংখলা প্রদেশের হাত ইয়াই জেলার গভীর জঙ্গলে গতকাল বৃহস্পতিবার আরও ৩০টি কবরের সন্ধান পাওয়া গেছে। তবে এ কবরগুলোতে কতজন অভিবাসীর কঙ্কাল বা দেহাবশেষ রয়েছে, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কিছু জানা যায়নি। এর আগে গত শুক্রবার থেকে গত বুধবার পর্যন্ত ছয় দিনে ওই জঙ্গলের বিভিন্ন স্থান থেকে ৩২ জন অভিবাসীর দেহাবশেষ ও তিনজনের কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়। কর্তৃপক্ষ ও জীবিত উদ্ধার হওয়া কয়েক অভিবাসীর ভাষ্য, এসব দেহাবশেষ ও কঙ্কাল পাচারকারীদের ঘাঁটি বা বন্দিশিবিরে হত্যার শিকার বাংলাদেশি এবং রোহিঙ্গা মুসলিমদের”।

এরপরে বাংলাদেশের অভিবাসীদের, বিশেষ করে নৌ-অভিবাসীদের বিষয়ে ধারাবাহিকভাবে খবর প্রকাশিত হতে থাকে। আমরা জানতে পারি ২০১৫ সালের প্রথম তিন মাসের মধ্যে ২৫ হাজারের বেশী বাংলাদেশী ও বার্মিজ মুসলিম (বা রোহিঙ্গা) বঙ্গপোসাগর দিয়ে মালয়শিয়া ও থাইল্যান্ডে অভিবাসন করেছে। এবং এই সংখ্যা গত বছরের তুলনায় দ্বিগুন। অর্থাৎ বাংলাদেশের নাগরিকদের একটা বড় অংশ প্রতিবছর দেশের বাইরে অভিবাসন করছে এবং সেটা রাষ্ট্রের সীমানা অতিক্রম করার আইন-কানুনের থোড়াই কেয়ার করে, জীবনের ঝুঁকি উপেক্ষা করে।

মানুষের অভিবাসনের প্রবণতা কি নতুন? না। মানুষের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় মানুষ নানা কারণে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় বসতি স্থাপন করেছে। শুধু উপনিবেশ স্থাপন করতে ইউরোপীয়রা মহাসাগর পাড়ি দিয়ে পূর্ব দিকে আসেনি। শুধু রেমিটেন্স কামাতে ‘তৃতীয়’ বিশ্ব থেকে শ্রমিক/পেশাজীবীরা ‘উন্নত’ বিশ্বে যাচ্ছেনা। ব্যবসা, বানিজ্য, উচ্চশিক্ষা, ধর্মপ্রচার, যুদ্ধ, নতুন দেশ দেখার আগ্রহ, অত্যাচার থেকে পলায়ন, এমনকি মনের দুখে বনবাসে যাবার আকাংখা থেকেও মানুষ অতীতে অভিবাসন করেছে এবং এখনও করে যাচ্ছে।পৃথিবীর মানুষের চেহারা, ভাষা, খাবার-দাবার, পোষাক, আচার-আচরণ তথা সংস্কৃতির দিকে লক্ষ্য করলে আমরা বৈচিত্র দেখি ঠিকই, একটি মিলও কিন্তু আছে এর মাঝে। আর সেটা হল মানুষে মানুষে মেলামেশা, মিশ্রন। পৃথিবীতে এমন যুগ আসেনি যেখানে মানুষের আনাগোনা, চলাফেরা বন্ধ থেকেছে।

কিন্তু উপনিবেশ অবস্থা থেকে স্বাধীন হয়ে যেই মাত্র আমরা জাতি-রাষ্ট্র বিশ্বব্যবস্থায় ঢুকলাম সেই মাত্র এই পৃথিবীর মানব সমাজের জন্য একটি বড় বিপদ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আর সেটা হল মানুষের রাষ্ট্র সীমা পার হবার স্বাধীনতা বন্ধ হওয়া। লক্ষ্যনীয়, রাষ্ট্রগুলোর সীমানা প্রাচীর উন্নত থেকে উন্নততর হচ্ছে, রাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনীগুলো সীমানা রক্ষায় দিনে দিনে আরও অমানবিক হচ্ছে, আধুনিক থেকে আধুনিকতর হচ্ছে তাদের ব্যবহৃত টেকনোলোজি ও হাতিয়ার আর কঠোর থেকে কঠোরতর হচ্ছে রাষ্ট্রীয় সীমানা পেরুনোর আইন-কানুন।

জাতি-রাষ্ট্রের বিশ্বব্যবস্থায় দ্বিতীয় ভয়ংকর যে উন্নতি/অবনতিটা হয়েছে সেটা ঘটেছে আমাদের চিন্তা ও চেতনায়। “এই পুরো পৃথিবীটা আমাদের সবার” এটা কেমন যেন অলীক, অবাস্তব, ইউটোপিয়ান, আদর্শবাদী ফাঁকা বুলি বলে মনে হয় এখন আমাদের। বরং, আমি বাংলাদেশী, আপনি বৃটিশ কিংবা পাকিস্তানী বা ভারতীয় এভাবে আমরা নিজেরাই নিজেদের পরষ্পর থেকে বিচ্ছিন্ন জাতি বানিয়েছি। একেক জাতির মানুষ একেকটা ভূখন্ডে সীমাবদ্ধ থাকবে এটাই এ যুগে স্বাভাবিক আর সন্দেহাতীত বলে ধরে নিয়েছি আমরা। কারও কারও ক্ষেত্রে তো “আমি এই মাটির সন্তান” এই দাবীটি হয়ে উঠেছে প্রাণের চেয়েও দামী। এই চিন্তা আচ্ছন্ন করে ফেলেছে শুধু রাষ্ট্র নায়কদের না, বিজ্ঞানীদের, বিপ্লবীদের, এমনকি সাধারণ মানুষদেরও।

জাতি-রাষ্ট্রকে মানব ইতিহাসের সার্বজনীন একটি অবস্থা হিসেবে দেখার এই দৃষ্টিভঙ্গীর সমস্যা বোঝা যায় যখন বাংলাদেশের নাগরিকরা নৌ-পথে অভিবাসনের সময় মানবেতর পরিস্থিতির সম্মুখীন হন সেটা জেনে আমরা বিচলিত হই এবং সে আমরাই আবার সরকারকে দাবী করি অভিবাসনের নিয়মনীতি আরও কঠোর করার জন্য, এই ব্যবসার ( নীতিবাগিশদের চোখে চোরা-কারবার) সাথে জড়িতদের দমন করার জন্য। রাষ্ট্রের সীমানা যে একটা গুরুত্বপূর্ণ বাধা মানুষের জীবনের জন্য সেটা আমরা ধীরে ধীরে ভুলতে বসেছি। অথচ ১৯৪৭ এর আগে এই ভারতীয় উপমহাদেশেই বা কে ভেবেছিল এতো কঠিন আর অপ্রতিরোধ্য সীমানা প্রাচীরের কথা? পাসপোর্ট নামের নথিটি প্রচলন হল সেটি তো মাত্র ১৯৫০ এর ঘটনা!

বাংলাদেশের নাগরিদের লাশ যখন মালয়শিয়া বা থাইল্যান্ডে পাওয়া যাচ্ছিল সেই একই সময়ে ভুমধ্যসাগরেও নৌ-অভিবাসীদের ইউরোপে প্রবেশের খবর প্রচার হচ্ছিল। যদিও সেখানকার কোস্ট গার্ডরা খানিকটা মানুষের মত আচরণ করছিল অভিবাসীদের সাগরে ডুবিয়ে না দিয়ে, অনেক ইউরোপীয় ধনী ব্যক্তি নিজেদের জাহাজ নিয়ে নেমে পড়েছিল নৌ-অভিবাসীদের উদ্ধার করতে কিন্তু চিন্তা-ভাবনায় সেখানেও সেই একই সমস্যা। অভিবাসী মানুষ বহিরাগত, অনুপ্রবেশকারী। এভাবে রাষ্ট্র আর তার সীমানা হয়ে গেছে সাম্প্রতিক সময়ের দামী বিষয় আর মানুষের জীবন আর তার আকাংখা, চলাফেরার স্বাভাবিক বাসনা হয়ে গেছে অপরাধ, অস্বাভাবিক।

আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে থাইল্যান্ড ও মালয়শিয়ায় অভিবাসীদের মানবিক বিপর্যয়ে শোকাহত পাঠক/দর্শকদের স্তম্ভিত করে দিয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য দেন (২৭ মে ২০১৫) – “… সাগরপথে বিদেশ যাবার চেষ্টা মানসিক অসুস্থতা। …এরা দেশের সুনাম ক্ষুণ্ন করছে…তাই এভাবে যারা বিদেশ যেতে চায় এবং যেসব দালাল এই মানবপাচারের সাথে জড়িত তাদের শাস্তির আওতায় আনা হবে”। এখন আপনি যদি জাতি-রাষ্ট্রকে সবচেয়ে উৎকৃষ্ট, কাঙ্খিত আর সর্বশেষ সংগঠন বলে ধরে নেন তাহলে প্রধানমন্ত্রীকে বাংলাদেশ রাষ্ট্র সীমানার সবচেয়ে বড় চৌকিদার মানতেই হবে এবং সেক্ষেত্রে তার বক্তব্যটি একজন দায়িত্বশীল মানুষের বক্তব্য বলেই ধরে নিতে হবে। আমার মনে হয় গণমাধ্যম প্রধানমন্ত্রী এবং এই ধরনের পেশাদার ব্যক্তিদের অমানবিক প্রমাণ করতে ইচ্ছে করেই তাদের এরকম বক্তব্য প্রচার করে যেন জনগণ ভয়ে ভয়ে থাকে, অসদাচরণ না করে। অভিবাসীরা বিশেষ করে নৌ-অভিবাসীরা গণমাধ্যমের চোখে স্রেফ কিছু গরীবগুবো ভিক্টিম।

Tulip Siddique with her aunt Bangladesh PM Sheikh Hasina

Bangladeshi-British Tulip Siddique with her aunt Bangladesh PM Sheikh Hasina

একই সময়ে (৮ মে ২০১৫) প্রধানমন্ত্রীর অন্য আরেকটি খবর প্রকাশিত হয়। সেখানে তিনি (এবং রাষ্ট্রপতিও) বৃটেনে বাংলাদেশী অভিবাসীদের অভিনন্দন জানান, বৃটেনের পার্লামেন্ট মেম্বার হিসেবে  তাদের সমাজের তিন কণ্যাকে নির্বাচিত করার জন্য। তিন কন্যাদের একজন টিউলিপ সিদ্দিক।১৯৭০ এর দশকে বৃটেনে আশ্রয় প্রাপ্ত বাংলাদেশী অভিবাসী টিউলিপের মায়ের অনুভূতি জানতে চাইলে মিডিয়াকে তিনি নিম্নরূপ বলেন:

“…(সে) বঙ্গবন্ধুর নাতী মানে যে একটা দেশ সৃষ্টি করেছে…তার নাতি…এই বিদেশে, সে একটা পার্লামেন্টের এমপি হওয়া চার্টিখানি কথা না আর ইতিহাসে এরকম ঘটনা আছে কি না আমার জানা নেই। আমার জীবনে আমার বাবা সংসদে ছিলেন, আমার বোন, এখন আমার মেয়ে। এর চেয়ে গর্বের আর কি হতে পারে! আল্লাহ্‌র রহম আমাদের ওপর। ও (টিউলিপ) যেখানে থাকুক, যার জন্য হোক…আব্বা বলতেন, মানে বঙ্গবন্ধু বলতেন যে, অসহায় মানুষের পক্ষে থাকবা, মানুষকে সাহায্য করবা, মানুষ – নির্যাতিত নিপীড়িতদের দেখে রাখবা এবং এই নিষ্ঠার সাথে তুমি এগিয়ে যাবা। আমি রাজনীতির সঙ্গে নেই, কিন্তু রক্ত কথা বলে।…” [ ইউটিউব লিংক]

টিউলিপের মায়ের বক্তব্যে উঠে এসেছে যে টিউলিপের পরিবার বাংলাদেশের সমাজের অসহায় আর নিপীড়িত অংশ থেকে বিলেতে অভিবাসন করেনি। মানে, বৃটেনে সংখ্যালঘু/ক্ষমতাহীন যে সমাজ যেমন, শ্রমিক, সাধারণ সরকারি কর্মচারী, ছোট ব্যবসায়ী, অভিবাসীদের প্রতিনিধিত্ব করতে যে টিউলিপ লেবার পার্টির সাথে যুক্ত হয়ে হাউজ অব কমনসে দরকষাকষিতে নেমেছেন তিনি একই সাথে বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলটির সবচেয়ে ক্ষমতাধর পরিবারের রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয়। অবশ্য, হাউজ অব কমন্সে তার মেইডেন বক্তব্যে টিউলিপ তার মায়ের অভিবাসনের পেছনে ভিক্টিমহুডটি উল্লেখ করতে ভোলেনি। মনের আনন্দে অভিবাসন করেছেন সেটা হয়তো অপরাধ গণ্য হতে পারে, কে জানে। গুরুত্বপূর্ণ হল টিউলিপের এই আত্মীয়তার নেটওয়ার্ক রাষ্ট্র সীমানা দিয়ে কাটাকুটি করা আমাদের পৃথিবী আর মানব সমাজের বর্তমান অবস্থার আরেকটি অন্তর্নিহিত সমস্যা অনুধাবন করতে সাহায্য করে।

যারা নিজেদের ‘উন্নত বিশ্ব’ বলে দাবী করে, যেমন বৃটেন, তাদের মধ্যে রক্ষণশীল পার্টি যারা তারা অভিবাসীদের বিবেচনা করে সকল নষ্টের গোড়া হিসেবে। তার বিপরীতে লেবার পার্টি নিজেদের সমাজতন্ত্রী হিসেবে দাবী করতে চায়, ঐতিহাসিকভাবে যাদের যুক্ততা আছে বৃটেনের ট্রেড ইউনিয়নের আন্দোলনের সাথে। ‘উন্নত বিশ্বের’ এ ধরনের প্রগতিশীলদের পার্টিতে ডাইভার্সিটি বা বৈচিত্রের বেশ কদর আর বৈচিত্র বলতে এরা ধরে নেয় জাতিগত পরিচয়কে আর এই জাতিগত পরিচয় বা এথনিসিটিকে এরা বোঝে অভিবাসীটি কোন দেশ থেকে এসেছে সেই বিষয়টি। অভিবাসন নিয়ে কাজ করেন এমন অনেক সমাজ বিজ্ঞানীরা এ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন আসলেই কি একটি মানুষ কোন দেশের ‘বংশোদ্ভূত’ তা দিয়ে কি কিচ্ছু বোঝা যায়? যেমন, টিউলিপও বাংলাদেশী আর নৌ-অভিবাসী যারা থাইল্যান্ডের জঙ্গলে আটকা পড়লো তারাও বাংলাদেশী। টিউলিপ যে বৃটেনের এমপি হলেন সে শুধু বাংলাদেশী বলে না। এর সাথে তার ঝুলিতে আছে বাংলাদেশী প্রভাবশালী পরিবারের প্রেক্ষাপট, তার উচ্চ শিক্ষা পাবার সুযোগ আরও অনেক অনেক সুযোগ সুবিধা। আমার প্রশ্ন ক্ষমতাধরদের, এলিটদের, রাজনীতিবিদদের আত্মীয়রা অভিবাসন করে বিদেশের মাইনোরিটি বা সংখ্যালঘু কোটাতেও যদি রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জন করে তাহলে আমরা খুশী। কিন্তু তার আরেকটা মানে কি এই দাঁড়ায় না যে যারা বাংলাদেশে সুযোগ-সুবিধা থেকে বাদ পড়লো এখন তাদের মানসিকভাবে অসুস্থ বলে বা অবৈধ অভিবাসী বলে ক্রিমিনালাইজ করে আসলে আমরা মানে বিদ্বৎ সমাজ, সাংবাদিক আর রাষ্ট্র পরিচালক বাহাদুরেরা তাদেরকে সকল দেশ, চিন্তা-চেতনা, বিবেচনা থেকেই বাদ?

Advertisements

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s