Home

ধর্ষণের পরে আমি আহত হয়েছিলাম, কিন্তু সম্মানে আঘাত করা হয়নি 

আমি ধর্ষিত হয়েছিলাম, কিন্তু আমার সম্ভ্রমহানি ঘটেনি

লেখক ও সমাজ কর্মী, সোহায়লা আব্দুলালি

লেখক ও সমাজ কর্মী, সোহায়লা আব্দুলালি

সোহায়লা আব্দুলালি

৩২ বছর আগের কথা, আমার বয়স ১৭, আমরা বোম্বেতে থাকি, তখন আমি ধর্ষিত হয়েছিলাম, প্রায় জানে মেরে ফেলেছিল আমাকে। [ঘটনার] তিন বছর পরে ধর্ষণ প্রশ্নে সমাজের ভুল ধারণা ও নিশ্চুপতায় ক্রুদ্ধ হয়ে আমি স্বনামে আমার অভিজ্ঞতার বর্ণনাসহ একটা লেখা লিখি। লেখাটা নারী আন্দোলন এবং আমার পরিবারে ঝড় তুলেছিল, তারপরে নীরবে এটি [আমার কণ্ঠ] হারিয়ে যায়। গত সপ্তাহে আমার ইমেইল খুলে দেখি সেই লেখাটা। দিল্লীতে এক তরুণীর ধর্ষণ ও মৃত্যুকে ঘিরে যে তোলপাড় চলছে তারই অংশ হিসেবে কেউ আমার লেখাটা আবার অনলাইনে পোস্ট করেছে এবং লেখাটি বিদ্যুতের গতিতে ছড়িয়ে পড়েছে। লেখাটি আবার পোস্ট হওয়ার পর থেকেই মানুষের সংহতি ও সহমর্মিতার বহুবার্তা আমি পেয়েছি।

ধর্ষণের প্রতীক হয়ে ওঠা কোনও স্বস্তিকর অভিজ্ঞতা নয়। আমি কোনও এক্সপার্ট নই, আমি সকল ভিক্টিমের প্রতিনিধিও নই। আমি শুধু এইটুকুই বলতে পারি, দিল্লীতে গণধর্ষণের শিকার হওয়ার দুই সপ্তাহ পরে যে নারীটি মারা গেলেন এবং আরও অনেক [নারীর] মতন আমার গল্পটি ধর্ষণেই শেষ হয়নি, গল্পটি বলার জন্য আমি বেঁেচ আছি।

সেই রাতে আমি যখন আমি বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করছি, আমি বুঝতে পারিনি কোন জীবনের জন্য যুদ্ধ করছি। এক পুরুষ বন্ধুর সাথে বাড়ির কাছের পাহাড়ে আমি বেড়াতে গিয়েছিলাম। চারজন অস্ত্রধারী পুরুষ আমাদের আক্রমণ করে এবং একটা জনাকীর্ণ জায়গায় যেতে বাধ্য করে । সেখানে ওরা আমাকে কয়েক ঘন্টা ধরে ধর্ষণ এবং আমাদের দুজনকে নির্মমভাবে মারধর করে। আমাদের মেরে ফেলা উচিত কিনা এই নিয়ে নিজেদের মধ্যে তর্ক করে। অবশেষে আমাদের ছেড়ে দেয়।

১৭ বছর বয়সে আমি নিতান্তই ছেলেমানুষ ছিলাম। [ধর্ষকের সাথে] প্রাণ বাঁচানোর সংগ্রামে জিতে যাওয়ার পর জীবন আমাকে দু’হাত ভরে দিয়েছে। আহত, বেদনায় ঘোরগ্রস্ত আমি কোনও মতে বাড়ি ফিরলাম, ফিরলাম এক অনন্য পরিবারের কাছে। তাদের পাশে পেয়েছিলাম বলেই জীবন আমাকে নিরাশ করেনি। প্রকৃত প্রেমের সন্ধান পেয়েছি। বই লিখেছি। বনে ক্যাঙ্গারু দেখেছি। দৌড়ে বাস ধরেছি। প্রাণচঞ্চল সন্তান আছে আমার। নতুন শতাব্দীতে পা রেখেছি। প্রথম চুলটি পেকে সাদা হল।

কিন্তু আরও অনেকে আছে যারা এসব কিছুই জানবে না। তারা দেখবে না যে সময় বদলায়, এমন দিন আসে যখন একটা ঘটনাই আর জীবনের কেন্দ্রবিন্দু থাকে না। এমন দিন আসবে যখন তুমি যে কোনও মুহূর্তে যে কোনও পুরুষের দল আক্রমন করবে ভেবে আর পিছন ফিরে দেখছ না বার বার। একদিন গলা টিপে ধরার ভীতিকর স্মৃতিতে  তাড়িত না হয়েই তুমি গলায় ওড়না জড়াবে। একদিন তুমি আর ভয় পাবে না।

বলাৎকার ভয়াবহ। কিন্তু ভারতীয় নারীর চিন্তাজগতে যে সকল কারনে বলাৎকারকে ভয়াবহ হিসেবে খোদাই করা হয়েছে সে কারণে এটি ভয়াবহ নয়। ভয়াবহ কারণ তোমাকে আঘাত করা হয়েছে, কারণ তুমি আতঙ্কগ্রস্ত হয়েছ, অন্য একজন তোমার শরীর দখল নিয়ে তোমার অস্তিত্বকে আক্রমন করেছে। তোমার ‘সতীত্ব’হরণ করেছে এই কারণে ধর্ষণ ভয়াবহ নয় । তোমার ভাই ও বাবার সম্মানহানি ঘটেছে, এই কারনেও ধর্ষণ ভয়াবহ নয় । আমার সম্মান আমার যোনিতে – এই ধারণা আমি প্রত্যাখ্যান করি। যেমন আমি প্রত্যাখান করি পুরুষের বুদ্ধি তার অণ্ডকোষে।

আমরা যদি সম্মান, সম্ভ্রমের ধারণা হিসেব-নিকেশ থেকে বাদ দেই, বলাৎকার তারপরেও ভয়াবহই থাকবে। কিন্তু তখন এটি সমাজের নয়, ব্যক্তির। আমরা তখন ধর্ষণের শিকার নারীকে বস্তাপচা উপদেশের (কিভাবে তাদের লজ্জিত বোধ করা উচিত, বা অপরাধী বোধ করা উচিত) বদলে প্রকৃত সহমর্মীতা জানাতে পারব।

আমার উপর আক্রমনের এক সপ্তাহ পরে, আমি শহরের উপকণ্ঠে একজন নারীর ধর্ষিত হওয়ার কথা শুনেছিলাম। [নারীটি] বাড়িতে এসে রান্নাঘরে যায়, গায়ে আগুন দেয়, এবং মৃত্যুবরণ করে। যে আমাকে বলেছিল গল্পটি, সে স্বামীর সম্মান রক্ষার্থে [ধর্ষিত] নারীর আত্মত্যাগের ঘটনায় আপ্লুত ছিল। আমার বাবা-মায়ের কৃতিত্ব, এই আত্মত্যাগের মর্ম আমি কোনও দিন বুঝতে পারি নাই।

আইন ধর্ষকের প্রকৃত শাস্তি ও নারীর নিরাপত্তা বিধান করবে, কিন্ত একমাত্র পরিবার, স্বজন-প্রতিবেশীই সহমর্মীতার সাথে পাশে দাঁড়াতে পারে। একজন কিশোরী কিভাবে ধর্ষকের শাস্তি প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করবে যদি তার পরিবার তার পাশে না দাঁড়ায়? একজন স্ত্রী কি তার আক্রমনকারীর শাস্তি চাইতে পারে যদি তার স্বামী মনে করে আসলে আক্রমন হয়েছিল তার উপর, তার স্ত্রীর উপর নয়?

১৭ বছর বয়সে আমি ভেবেছিলাম এইভাবে আক্রমনের শিকার হওয়াই আমার জীবনের ভয়াবহতম ঘটনা। কিন্তু এখন ৪৭ বছর বয়সে আমি জানি, আমি ভুল ছিলাম: আমার ১১ বছরের মেয়ে আক্রান্ত হতে পারে এই দুর্ভাবনা, আশঙ্কার থেকে ভীতিকর আর কিছু নেই। [আমার মেয়ে ধর্ষিত হলে] আমার পরিবারের সম্মানহানি হবে সেই জন্য [ভীতিকর] নয়,[ভীতিকর] কারণ সমাজের প্রতি তার [আমার মেয়ের] বিশ্বাস আছে, সেই বিশ্বাস ভেঙ্গে যাবে ভাবতেই অপরিসীম কষ্ট হয়। যখন আমি পিছন ফিরে তাকাই তখন আমি ১৭ বছরের মেয়েটিকে নয় বরং সান্তনা দিতে চাই আমারা বাবা মাকে। আমার ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন জীবনটাকে তারা আবার আদর যত্নে গড়ে তুলেছে।

এখানেই আমাদের দায়িত্ব। আমরা যারা পরবর্তী প্রজন্মকে বড় করছি। আমাদের ছেলে এবং মেয়েকে স্বাধীন ও শ্রদ্ধাশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। যারা জানবে, যে সকল পুরুষ নারীকে আক্রমন করছে তারা একটা সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, যে সিদ্ধান্তের জন্য তাদেরকে শাস্তি পেতে হবে।

আমার বয়স যখন ১৭, তখন আমি ভাবতেও পারিনি যে ভারতে হাজার হাজার মানুষ ধর্ষণের বিরুদ্ধে মিছিল করবে, কিন্তু গত দু’সপ্তাহ ধরে তাই দেখছি আমরা। তবে আমাদের কাজ এখানেই শেষ নয়। কয়েক প্রজন্ম ধরে পিতৃতন্ত্র, বর্ণপ্রথা এবং সামাজিক ও যৌন অসমতার এক ব্যবস্থা তৈরি করেছি আমরা যা নির্যাতনকে লালন করে। ধর্ষণ, বলাৎকার আবহাওয়ার মতন অনিবার্য কিছু নয়। সম্মান, সম্ভ্রম এবং সে [নারী] কি পুরুষকে আহবান করল, নাকি করল না এধরণের বস্তাপচা আলাপ বাদ দিতে হবে। ধর্ষণের দায় যেখানে, ধর্ষনকে সেখানেই স্থাপন করতে হবে [আঙ্গুল তুলতে হবে]: যে পুরুষ ধর্ষণ করে এবং আমরা সকলে যারা ঘটনার শিকার নারীর দিকে আঙ্গুল তুলে ধর্ষক পুরুষদের পার পাইয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করি।

[অনুবাদকের টিকা: জীবন থেমে থাকে না। ধর্ষণের পরে একজন নারী তার জীবনকে কিভাবে গড়ে তোলে সেই কথা বলা হয় না। বলা হয় লজ্জার কথা, সম্ভ্রমহানির কথা। সমাজ-আইন-রাষ্ট্রের নারীকে রক্ষা করতে না পারার কথা ।বলা হয় ব্যবস্থার ব্যর্থতার কথা। এমনকি নারী আন্দোলনও ব্যর্থতার বয়ান তৈরিতে ব্যস্ত। যে নারী জীবন ও অস্তিত্বের উপর পুরুষের আক্রমনকে প্রতিহত করে জীবিত ফিরে এসেছে, সেই যুদ্ধ-জয়ের কথা কেন বলা হয় না? জানতে চেয়েছেন, সোহায়লা আব্দুলালি, মায়া এঞ্জেলোসহ জয়িতা আরো অনেকে। ঠোটকাটা-র পক্ষ থেকে ধারাবাহিকভাবে এই জয়িতাদের বয়ান প্রকাশ করা হবে। এই ধারাবাহিক উদ্যোগের প্রথম পোস্ট হিসেবে সোহায়লা আব্দুলালির ভাবনা প্রকাশ করা হলো। দিল্লিতে ধর্ষণের শিকার নারীর মৃত্যুর (২৮ ডিসেম্বর, ২০১২) প্রতিবাদে গড়ে ওঠা আন্দোলন চলাকালে  সোহায়লা আব্দুলালির মূল লেখাটি,I was wounded, My Honor wasnt ইংরেজিতে New York Times-এ ছাপা হয়েছিল। – সায়দিয়া গুলরুখ]

Advertisements

2 thoughts on “আমি আহত হয়েছিলাম, কিন্তু আমার সম্মানে আঘাত করা হয়নি

  1. মানবজাতির সম্মানের ধারনাটা আজও আমি ভালো করে বুঝে উঠতে পারলাম না। অযৌক্তিক কিছু মানুষ নিয়ে আমাদের সমাজগুলো তৈরী হয় আর শয়ে শয়ে অযৌক্তিক ধারনা জন্ম নিতে থাকে।

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s