Home

নাসরিন সিরাজ: ঠোঁটকাটা থেকে আমরা আলাপ করছিলাম বাংলাদেশে যৌন নিপীড়ন বিরোধী আন্দোলন নিয়ে। ১৯৯২ তে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের অভ্যুত্থানকে স্মরণ করলে আন্দোলনটি এ’বছর ২৪ এ পড়লো। ১৯৯২ এর আন্দোলন নিয়ে লিখেছেন সাদাফ নূর-এ ইসলাম, কথা বলেছেন মীর্জা তাসলিমা সুলতানা। ১৯৯৫ এর আন্দোলন নিয়ে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন শামীমা বিনতে রহমান। এই পর্বে আমি তোমাকে প্রশ্ন করতে চাই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮ই মার্চ পর্ষদ সংগঠনটি নিয়ে, যেটা ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৯৮ এর ধর্ষণ বিরোধী আন্দোলন সংগঠন ও দিক নির্দেশনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বলে আমি মনে করি। এই সংগঠনটিতে আমি সরাসরি যুক্ত ছিলাম না, কিন্তু দূর থেকে খেয়াল করছিলাম আমাদের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা শিক্ষক রেহনুমা আহমেদ তাঁর ঘনিষ্ঠ সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের নিয়ে ক্যাম্পাসে প্রথম একটি নারীবাদী সংগঠন দাঁড় করাতে ছুটোছুটি করছেন। সেই সংগঠনের তৎপরতা থেকেই কিন্তু আমি তোমাকে আলাদা করে চিনতে শুরু করি। কেন, কিভাবে, কোন উপলব্ধি থেকে তোমরা সংগঠনটি দাঁড় করালে?

ঠোঁটকাটা আলাপ: সায়দিয়া গুলরুখ ও নাসরিন সিরাজ @আলোকচিত্রী: নাঈম মোহায়মেন

ঠোঁটকাটা আলাপ: সায়দিয়া গুলরুখ ও নাসরিন সিরাজ @আলোকচিত্রী: নাঈম মোহায়মেন

সায়দিয়া গুলরুখ: আমরা সম্ভবত ১৯৯৩-এর শেষের দিকে নৃবিজ্ঞান বিভাগে ক্লাস শুরু করি। প্রথম দুই বছর অদ্ভুতুড়ে, মানে ঔপনিবেশিক ঘারানার নৃবিজ্ঞানের পাঠ দান চলে । এখন যে নৃবিজ্ঞান চর্চার সাথে আমি যুক্তবোধ করি তার থেকে সেটা ছিল কয়েকশ মাইল দূরে। একটা দুইটা উদাহরণ দেই। তাহলে স্পষ্ট হবে। যেমন ধরো, প্রথম বর্ষে একটা কোর্স ছিল, নিশ্চয়ই তোমারও মনে আছে, “অন্য সংস্কৃতি” নামে। নৃবিজ্ঞান অন্য সংস্কৃতির অধ্যয়ন ইত্যাদি লেকচার দেয়া হত। একটু হাসি পাচ্ছে এখন ভেবে। যদিও বিষয়টি একেবারেই হালকা কিছু না। তো প্রশ্ন হল “অন্য” কে? ঐ সময়ে আমি অন্তত গ্রাম-শহরের খেটে খাওয়া মানুষকে বা বাঙালী-বনাম অপরাপর সকল জাতিকে অন্য হিসেবে চিনতাম না, অজ্ঞতা ছিল নিঃসন্দেহে। কিন্তু ক্লাসে যখন বাংলাদেশের অন্য জনগোষ্ঠী তথা বাংলাদেশের নৃবিজ্ঞানের বিষয়বস্তু হিসেবে অ-বাঙালী জাতিদের উপস্থাপন করা হল, আমি, আমরা বেশ কয়েকজন বেশ অবাক হলাম। এই ক্লাসটাতে একটা ১০ নম্বরের এ্যাসাইনমেন্ট ছিল, যেখানে আমাদের এথনোগ্রাফিক গবেষণার হাতেখড়ি হয়। আমাদেরকে বলা হল, একটা কিছু অন্য সংস্কৃতির উপরে স্বল্প পরিসরে কাজ করে, ৪/৫টা সাক্ষাৎকার নিয়ে একটা গবেষণা প্রতিবেদন জমা দিতে। এ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে আলাপ করতে করতে, এক ছাত্রের একটা প্রশ্নের জবাবে কোর্স শিক্ষক বললেন, হলের আদিবাসী ছেলেমেয়েদের জ্ঞাতিসম্পর্ক নিয়ে কাজ করতে পারি আমরা, আবার যার যার বাসার ‘কাজের বুয়া’র সাথেও কথা বলতে পারি। আমার আক্কেল গু-ড়ু-ম। বলছেন কি এই শিক্ষক ? ওনার কথায় জাতিগত বৈষম্যটাকে বুঝতে পারার মতন বুদ্ধিবৃত্তিক পরিপক্কতা আমার ছিল না তখন। কিন্তু আমার মায়ের কারণে ‘কাজের বুয়া’ ধারাণাটার সাথে যে সামাজিক অবজ্ঞা, অবহেলা যুক্ত সেটার সাথে পরিচিত ছিলাম। আমার মা আমাদেরকে বুদ্ধি হওয়ার সাথে সাথে স্পষ্ট বলে দিয়েছিলেন, “ঘরের কাজ যে সামলে রাখে সে যদি কাজের বুয়া হয় তাহলে তুমিও কাজের বুয়া”। তাই শ্রেণী বৈষম্য আমি স্পষ্ট চিনতে পেরেছিলাম। বেশ ভ্যাবাচ্যাকা খেলাম।

দ্বিতীয় বর্ষ। আমাদের বাংলাদেশ, সমাজ ও সংস্কৃতি ক্লাস। বাংলাদেশের রাজনীতি ইতিহাস নিয়ে কথা-বার্তা হয় ক্লাসে। তখন ঢাকা আরিচা সড়কে গাবতলীর কাছে ব্যাপক ট্রাফিক-জ্যাম হত। ঘন্টার পর ঘন্টা। প্রায় নিয়মিত ঘটনা ছিল। তো একদিন রাস্তার জ্যাম ইত্যাদি থেকে আলাপ দুর্নীতি বিষয়ে কি করা যায় এসে পৌঁছাল। শিক্ষক জানতে চাইল কি করা যায়। তখনকার ছাত্রী-ছাত্ররা, মানে আমরা, ম্যালা কথা-বার্তা বলতাম। শিক্ষক প্রশ্ন করলেআমরা আপন মনে উত্তর দিতাম। আমাদের কারও উত্তরই কোর্স শিক্ষকের মনোঃপুত হল না। তিনি বলে বসলেন, আমাদের মতন দেশের জন্য সামরিক শাসনই যথার্থ। আবারও আমার আক্কেল গু-ড়ু-ম । ১৯৯০-এর স্বৈরচার সরকার বিরোধী গণ অভ্যুত্থানের স্মৃতি তখনও সতেজ। আমার কলেজের বন্ধু-বান্ধবের সাথে আমরা ঢাকায় গিয়েছি দল বেঁধে। বিজয় মিছিলে যোগ দিয়েছি। আমরাতো ক্যাম্পাসেই থাকতাম ( উল্লেখ্য, সায়দিয়ার বাবা ছিলেন জাহাঙ্গীরনগরের ভূগোলের শিক্ষক। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্বও পালন করেন)। ক্যাম্পাসের মেয়ে-ছেলেরা মিলে আমরা একটা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করলাম। সেখানেই আমি দীনেশ দাসের “কাস্তেটা শাণ দিও বন্ধু” কবিতটির সাথে পরিচিত হই।এক অর্থে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাম আন্দোলনের সাথেও আমার পরিচয় ঘটলো।
বেয়নেট হোক যত ধারালো,
কাস্তেটা শান দিও বন্ধু।
শেল আর বোম হোক ভারালো,
কাস্তেটা শান দিও বন্ধু।
বাঁকানো চাঁদের সাদা ফালিটি,
তুমি বুঝি খুব ভালোবাসতে?
চাঁদের শতক আজ নহে তো.
এ-যুগের চাঁদ হল কাস্তে।
ছাত্রফ্রন্টের সেবা আপা, মিঠু ভাইয়ের সাথে আমার সেই সময়ই পরিচয় হয়। তো যেটা বলছিলাম। নৃবিজ্ঞান বিভাগের ক্লাশরুমে ঐ বছরগুলোতে যে নৃবিজ্ঞানের চর্চা হত তার সাথে বাংলাদেশের চলমান সামাজিক, রাজনৈতিক বাস্তবতার কোনও র-ক-ম সম্পর্ক ছিল না। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে, অন্তত আমাদের জন্য ৮ই মার্চ পর্ষদ ছিল ক্লাসরুম আর বাংলাদেশের চলমান সামাজিক, রাজনৈতিক বাস্তবতার একটা সেতুবন্ধ। ৮ই মার্চ পর্ষদের মাধ্যমে আমি সামাজিক আন্দোলন আর পড়াশুনার যোগসুত্র খুঁজে পেলাম।আমি বলতে চাই ৮ই মার্চ পর্ষদ কয়েকজন শিক্ষকের রেডিকাল টিচিং (Radical Teaching), লড়াকু পাঠদানের ফসল। আমাদের তৃতীয় বর্ষে, ততদিনে তোমরাও ক্যাম্পাসে চলে এসেছো…

নাসরিন: হ্যাঁ, তখন আমরা দ্বিতীয় বর্ষে…

সায়দিয়া: … নৃবিজ্ঞান বিভাগের অনুশীলিত ঔপনিবেশিক নৃবিজ্ঞান চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়। মানস চৌধুরী, সাঈদ ফেরদৌস লেকচারার হিসেবে বিভাগে যোগ দেন। আমার এখনও মনে আছে, ক্লাসে আমরা মার্ক্সবাদ সম্পর্কে পড়লাম, পরীক্ষায় প্রশ্ন আসলো, “পারিবারিক সম্পর্ক কি অর্থনৈতিক সম্পর্ক?”

নাসরিন: আমি তোমার সাথে এখানে একটু যুক্ত করতে চাই। ভাল হল তুমি যৌন নিপীড়ন বিরোধী আন্দোলন সংগঠন প্রসঙ্গে রাজনীতি ও সমাজ কাঠামোর আমূল পরিবর্তনে বিশ্বাসী শিক্ষা ও শিক্ষকতার প্রসঙ্গটি তুলেছো।খেয়াল কর আমাদের বেড়ে ওঠা। আমরা স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের সকল উত্তাপ নিয়ে গণতন্ত্র নামক এক অলীক স্বপ্ন হয়তো বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে এরকম একটা অনিশ্চিত আশা নিয়ে বিশ্ববিদ্যাালয়ে পা রেখেছি। সমাজের বৈষম্য চেনাতে, বোঝাতে পারে, পাল্টে ফেলতে পারার রাস্তা দেখাতে পারে এরকম শিক্ষক আর ক্লাশরুমছাড়া ঐ সময় আমাদের মত তরুনদের আর কি আকর্ষণ করতে পারতো এটা আমার মাথায়ই আসে না। যখন নৃবিজ্ঞানে ভর্তি পরীক্ষা দিই তখন আমি জানতামই না নৃবিজ্ঞান মানে কি। কিন্তু পরীক্ষার প্রশ্ন পড়েই আমার মনে হল আমি আমার স্কুল খুঁজে পেয়েছি। হুবুহু না হলেও সেই প্রশ্নটার মূল এসেন্সটা আমার এখনও মনে আছে : “একটা বিয়ের অনুষ্ঠানে দাওয়াত দেয়ার সময় কোন কোন বিষয়গুলো আমল দেয়া হয়?” সমাজের একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে তখনই তো আমার পর্যবেক্ষণ ছিল যে শুধু নিকট আত্মীয়-স্বজন-বন্ধু-প্রতিবেশীই নয়, বিয়ের মত একটা গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক অনুষ্ঠানের দাওয়াত দেয়ায় কাজ করে সামাজিক মান-মর্যাদা প্রদর্শনের বিষয়টিও। ভাবলাম যে সমাজের যেসব বিষয় আমাকে ডিসটার্ব করে সেগুলো বোঝার একটা রাস্তা পাবো, কিন্তু ক্লাশ শুরু হবার পর দেখি আমি নৃবিজ্ঞানের প্রতি কোন আকর্ষণই বোধ করছি না, যদিও বরাবরই ক্লাশে নিয়মিত ছিলাম। ক্লাশরুমের প্রতি আকর্ষণ ফেরাতে তোমার মত আমারও তৃতীয় বর্ষ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়…

সায়দিয়া : হ্যাঁ, সময়টা ১৯৯৫-৯৭। ঐ সময়েই রেহনুমা আহমেদ শিক্ষা ছুটি শেষে বিভাগে যোগ দিয়েছেন। মির্জা তাসলিমাও শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জাহাঙ্গীরনগরে যোগদিয়েছেন। নৃবিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষটা আমার রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে একটা দারুন সময় ছিল। তোমার মনে আছে? আমরা, তোমাদের ব্যাচ, আর আমাদের ব্যাচ সামাজিক অসমতার ক্লাসটা একসাথে করতাম। আনু [মুহাম্মদ] স্যার সাম্প্রতিক নৃবিজ্ঞান পড়াতেন। সেই ক্লাসে আমরা এ্যাসাইনমেন্টে বাংলাদেশ উন্নয়ন নীতি বিশ্লেষণ করলাম…

নাসরিন: আনু স্যারের প্রতি তো আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। সত্যি বলছি, ওনার ঐ কোর্সের আগ পর্যন্ত আমি দিশা পাচ্ছিলাম না সোসাইটি, কালচার, কিনশিপ, ব্যান্ড, ট্রাইব, ক্ল্যান এসব ছাতা মাথা পড়ে আমার আমার কি ঘোড়ার ডিম উপকার হবে। আমি এবং আমার এক সহপাঠী গ্্রুপ করে ওনার কোর্সে পার্বত্য চট্টগ্রামে চলমান জাতিগত দ্বন্দ্ব ইস্যুতে নিজেদের মত করে কাজ করলাম। ওনার ঐ কোর্স পড়ানোর স্টাইলটাও আমার র‌্যাডিকাল লেগেছিল। সহপাঠীরা দলে দলে ভাগ হয়ে নিজেদের আগ্রহের ইস্যু বাছাই করে, নিজেদের মত করে গবেষণা প্রশ্ন তৈরী করে এবার উত্তর খোঁজ আর লেখ। তখন তো দেখেছি শুধু লেকচার পদ্ধতিতেই শিক্ষকরা পড়াচ্ছেন। মহা বিরক্ত ছিলাম আমি সেই নিয়ে। তখন পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি হচ্ছে হচ্ছে এরকম একটা আবহাওয়া। পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ, হিল উইমেন্স ফেডারেশনের লিফলেট-পত্র-পত্রিকা পড়তাম, পাশাপাশি “মূল” ধারার পত্রিকায় প্রকাশিত প্রো-আর্মি খবর ও কলাম। রাগে গা রি রি করতো কিন্তু কেন করতো বুঝতাম না। এগুলো বিশ্লেষণ করা যে একটা বিদ্যাজাগতিক কাজ সেটাই স্যারের কোর্সে উপলব্ধি হল আমার। বুঝলাম যে লেখাপড়া করাটা একটা ইউসফুল কাজ। নৃবিজ্ঞান কোথায় এপ্লাই করবো সে বিষয়ে কোন কোন শিক্ষেকর  লেকচার শুনে মনে হত নৃবিজ্ঞানীর কাজ শুধু এনজিওর ফিল্ড ডাটা কালেকটার হওয়া। অসহ্য!

সায়দিয়া: সামাজিক অসমতার ক্লাসটা রেহনুমা [আহমেদ] ম্যাডাম পড়াতেন, সেই ক্লাসে আমরা ফেলাসিটি এ্যাডহোম আর অলিভিয়া হ্যারিসের সম্পাদিত, Of Marriage and  Market-বইটা পড়লাম। একদিকে বাসায় বিয়ে নিয়ে আত্মীয়-স্বজনের হাঙ্গামা অন্যদিকে ক্লাসরুমে বিয়েকে বাজার ব্যবস্থার অংশ হিসেবে চিনে নেয়া, বিশ্লেষণ করার পথ পেলাম। এক অর্থে এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই করতেই শিখলাম। আনু স্যার, নাসিম [আখতার হোসেইন] ম্যাডাম নৃবিজ্ঞান বিভাগের ছিলেন না। শম্পা অর্থনীতি বিভাগের আর শামীমা প্রতœতত্ত্ব। এঁরা সবাই ৮ই মার্চ পর্ষদে ছিল ওদের যুক্ততার নিশ্চয়ই অন্য গল্প আছে, কিন্তু আমি বলতে চাই ৮ই মার্চ পর্যদের শুরুর ইতিহাসে নৃবিজ্ঞান বিভাগে আমাদের পড়াশোনার একটা বড় ভূমিকা ছিল। একটি নারীবাদী ছাত্রী সংগঠন গড়ে ওঠার পেছনে একটা বিভাগের পড়াশোনাই একমাত্র কারণ হতেই পারে না। সেটা আমি দাবীও করতে চাই না। তবে আমার স্মৃতিতে আমি ৮ই মার্চ পর্ষদের সংগঠিত হওয়া আর নৃবিজ্ঞান বিভাগের পূর্বাপর ঔপনিবেশিক/পশ্চিমা নৃবিজ্ঞান চর্চাকে চ্যালেঞ্জ করার মুহূর্তটাকে আমি আলাদা করতে পারি না। তোমার নিশ্চয়ই মনে পড়ে যে ১৯৯৮ -এর ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনক জাহাঙ্গীরনগন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন “নৃবিজ্ঞান বিভাগের কতিপয় শিক্ষকের চক্রান্ত” পর্যন্ত বলেছে।

নাসরিন: অবশ্যই মনে আছে। “কতিপয়” শিক্ষকদের নিয়ে কুৎসামূলক কুপ্রচারনা চালাতেও প্রশাসন সে সময় দ্বিধা করেনি…

ঠোঁটকাটা আলাপ: সায়দিয়া গুলরুখ ও নাসরিন সিরাজ @আলোকচিত্রী: নাঈম মোহায়মেন

ঠোঁটকাটা আলাপ: সায়দিয়া গুলরুখ ও নাসরিন সিরাজ @আলোকচিত্রী: নাঈম মোহায়মেন

সায়দিয়া: এবারে সরাসরি ক্যাম্পাসে পুরুষাধিপত্যের কথা বলি। আবারও তোমার জন্য নতুন কোনও প্রসঙ্গ না, এই ক্যাম্পাসের অলি-গলি তোমারও চেনা। বিশ্ববিদ্যালয়ের দৈনন্দিন জীবনে নানাভাবে নারী হিসেবে হেনস্থা হতে হয়। বিভাগের উদাহরণ দিয়েই শুরু করি। প্রথমে বর্ষে ক্লাস শুরু করার কয়েক সপ্তাহ পরেই টের পেলাম, একজন কোর্স শিক্ষক আমাদের ব্যাচের দুজন সহপাঠীকে অযাচিত মনোযোগ দেন। পরে শুনলাম প্রতি ব্যাচেই তাঁর এমন একজন পছন্দের ছাত্রী থাকে — যেই ছাত্রীটা প্রথাগত নজরে দেখতে ভালো, শহুরে, স্মার্ট সেই তাঁর মনোযোগের পাত্রী। খুবই অস্বস্তিকর, যাকে টার্গেট করা হচ্ছে তার জন্য এবং অন্য সবার জন্য। সরাসরি যৌনাত্মক কিছু ছিল না এই মনোযোগে, কিন্তু এই বাড়তি মনোযোগটা যৌনবাদী, কোনও ছেলে কখনও এই অর্থে সেই শিক্ষকের সুনজরে আসেননি।

প্রথম বর্ষে আরও একটা কথা খুব স্পষ্ট মনে আছে। অর্থনীতির কোর্স, আমাদের supplementary course  । ক্লাসে চাহিদা ও উপযোগীতার তত্ত্ব পড়াতে গিয়ে কোর্স শিক্ষক আরামসে লম্বা সময় ধরে, মেয়েদের ব্রা/অর্ন্তবাস গোলাপফুল আর লবনের চাহিদা নিয়ে আলাপ করতে থাকলো। ছেলেরা ফ্যাচফ্যাচ করে হাসছে। মেয়েরা মাথা নিচু করে বসে আছে। মেয়েদের ব্রা/অর্ন্তবাসের মতন সাধারণ একটা জিনিস কি করে এত উত্তেজনা তৈরি করে তা অবশ্য আমি আজও উদ্ধার করতে পারি নাই।

এই ছিল দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসের অভিজ্ঞতা আর বলতে চাই না। বাসের ভীড়ে মেয়েদের গায়ে হাত দেয়ার ঘটনা ১৯৯২’র আন্দোলনের আগে হরদম ঘটতো। আর প্রেম প্রস্তাবের উৎপাতের কথাতো বাদই দিলাম। এমনই একটা ঘটনার প্রেক্ষিতে সীমান্তবিরোধী আন্দোলন গড়ে ওঠে ক্যাম্পাসে। সেই আন্দোলনের অভিজ্ঞতা নিয়ে তুমি শামীমার সাথে কথা বলেছ। সংক্ষেপে বললে, প্রতœতত্ত্ব বিভাগের ছাত্র সীমান্ত আমাদের ব্যাচের অথনীতি বিভাগের একটা মেয়েকে অনেকদিন ধরে প্রেম প্রস্তাব দিচ্ছে, প্রেমে প্রত্যাখাত হয়ে সে মেয়েটিকে নানা ভাবে হয়রানি করতে থাকে। তারই প্রতিবাদ, বিচারের দাবীতে আমরা আন্দোলন করেছি । এটা ১৯৯৫ সালের ঘটনা।

আন্দোলন তখনও চলছে। আমরা মিছিল নিয়ে প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান ধর্মঘট করছি। এমন সময় অভিযুক্ত ছাত্র সীমান্ত তার বাইকে চড়ে এক্কেবারে আমাদের জমায়েতের উপর চলে আসে, শাসায় আমাদের, কে তার বিচার করে দেখে নেবে।

বিচার হয়নি, অভিযোগকারী পড়া শেষ না করে ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে গিয়েছে। আর আমরা শুনেছি, সীমান্ত পুলিশের চাকরি করে এখন। আন্দোলনের এই পরিণতি আমাদেরকে স্তম্ভিত করেছিল। তখন ছোট ছিলাম, বিচার না হওয়াটাই যে স্বাভাবিক, সেটা তখনও জানতাম না, বুঝতাম না। তাই আন্দোলন থেমে গেলেও আমার/আমাদের ক্ষোভ আরও তীব্র হতে থাকল। ক্যাম্পাসে যৌন নিপীড়নের বিষয়টা চাপা পড়ল না।
’৯৫-৯৬ সালের এই সময়টাতে আরও কিছু ঘটনা ঘটল। প্রীতিলতা হলের প্রভোস্ট, পরিসংখ্যান বিভাগের একজন শিক্ষক ছিলেন। তিনি হলের প্রথম বর্ষের ছাত্রীদের টার্গেট করে নানাভাবে হেনস্থাকরতেন । ছাত্রীরা বাধ্য হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের কাছে তার ক্ষমতার অপব্যবহার সম্পর্কে লিখিত অভিযোগ করে: ছাত্রীদের অভিভাবকদের সাথে দুর্বব্যাবহার, প্রেম করা নিয়ে কটাক্ষ করা, হলে কটায় ফিরল তার নজরদারী। লিখিত অভিযোগের বাইরেও অভিযোগ ছিল। তোমারও মনে পড়বে, এই প্রভোস্ট আচমকা ছাত্রী হলে প্রবেশ করতো, এমনকি বাথরুমেও। প্রভোস্টের এই “তথাকথিত অসদাচারণে”র খবর তখনকার ভোরের কাগজে ছাপা হল। কোন ছাত্রী সিগেরেট খায়, কোন ছাত্রী প্রেম করে প্রভোস্ট মহাশয় এইসবের হিসেব-নিকেশে ব্যস্ত। নৃবিজ্ঞানের তিনজন ছাত্রীকে হয়রানি করার জন্য লেসবিয়ান আখ্যা দিল। লেসবিয়ান হলেই বা কি মহাভারত অশুদ্ধ হবে! প্রশাসনিক কাঠামো ও ক্ষমতার বরাতে ছাত্রীরা যৌন/হয়রানির শিকার হচ্ছে। রাগে ক্ষোভে আমরা প্রায় দিশেহারা।

সীমান্ত বিরোধী আন্দোলনের সূত্রে শম্পা, শামীমা, সাদাফ, সায়েমা, আমি আর শিক্ষকদের মধ্যে রেহনুমা আহমেদ, আনু মুহাম্মদ, সাঈদ ফেরদৌস, মানস চৌধুরী ও মির্জা তাসলিমা — আমাদের একটা যোগাযোগ তৈরি হয়েছে। ক্যাম্পাসে ফিসফিস ধর্ষনের গুজব শুরু হয়েছে। আমরা সকলে প্রায়ই দুপুরের পরে আলাপ-আলোচনায় বসি। এই প্রথম দিককার সভাগুলো অনেকটা কে কোথায় কি শুনেছি, কি হয়েছে, এসব নিয়ে পরষ্পরকে ওয়াকিবহাল করতাম। এই সভাগুলো আনু স্যার বা রেহনুমা ম্যাডামের অফিসঘরে হত। আমরা ছাত্রীরা সিঙ্গাড়া খেতাম, আর হাত পা নেড়ে আমাদের রাগ প্রকাশ করতাম, গজগজ করতাম। এখন বুঝি, আমাদের ক্ষোভ নিশ্চয়ই আমাদের শিক্ষকদের আশ্বস্ত, আশাবাদী করেছিল।

কি করা যায়, এসব নিয়ে কথা-বার্তা চলছে। এর মধ্যে ১৯৯৭ সালের আন্তর্জাতিক নারী দিবস চলে এসেছে। আমরা ঠিক করলাম ক্যাম্পাসে আন্তর্জাাতিক নারী দিবস পালন করব। দিবস উদযাপন উপলক্ষ্যে করব। আন্তর্জাতিক নারী দিবস উদযাপন কমিটির ব্যানারে আমরা পোস্টার লিখতে বসলাম। ক্যাম্পাসে পুরুষাধিপত্য রুখে দাঁড়ান। এই ক্যাম্পাসে ধর্ষণ, যৌন হয়রানি সহ্য করা হবে না। পাশাপাশি বৈষম্যমূলক ছাত্রী-ছাত্র আচরণবিধি বদলেরও দাবি তুললাম আমরা। বিবাহিত নারী শিক্ষার্থী হতে বাধা কোথায় (নারী বিবাহিত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক বিধিমালা মতে ভর্তি হতে পারবে না)? আমরা বললাম, বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন নিপীড়নবিরোধী নীতিমালা গ্রহণ করতে হবে, আর সূর্যাস্ত আইন বাতিল করতে হবে।
ক্যাম্পাসের দেয়ালে, একদম নাকের ডগায়, পুরুষাধিপত্য রুখে দাঁড়ান শ্লোগান, যৌননিপীড়ন বা ধর্ষণ শব্দগুলো ছাত্র-শিক্ষক-প্রশাসনিক মহলে অস্বস্তি তৈরি করল। দু’একটা জায়গায় প্রান্তিকগেটে পোস্টার কে বা কারা যেন ভোর না হতেই ছিঁড়ে ফেলেছিল।

পুরো ক্যাম্পাস ছেয়ে ফেললাম আমরা। এই পোস্টারিং-এর সাথে আমরা একটা দেয়ালিকা বের করলাম, “কেন দাঁড়াবো না রুখে?” এই দেয়ালিকাটায় একটা আইটেম ছিল, বাসে যৌন হয়রানি কিভাবে মোকাবিলা করবেন? আমরা ঘন্টার পর ঘন্টা বসে এসব বের করলাম: আপনার পাশে দাড়ানো পুরুষটি আপনার গায়ে হাত দিলে পায়ের হিলসহ পুরুষটির পায়ে দাঁড়িয়ে পড়ুন; সাথে ভারি বইয়ের ব্যাগ থাকলে ব্যাগ দিয়ে জোরে ধাক্কা দিন; প্রয়োজনে কনুই ব্যাবহার করুন; ব্যাগে সেফটিপিনও রাখতে পারেন। এই মনে পড়ছে। আমরা বেশ ১০/১২টা বুদ্ধি বের করেছিলাম। দেয়ালিকা ঝুলালাম সমাজ বিজ্ঞান অনুষদে। ১৯৯৭ সালে ৮ই মার্চ। সকাল ১০টায় “ক্যাম্পাসে সকল পুরুষাধিপত্য রুখে দাঁড়াও” ব্যানার নিয়ে আমাদের র‌্যালী বের হল। অনেক ছাত্রীরাই মিছিলে অংশ নিল। এই হচ্ছে শুরু।

ইতিমধ্যে সাঈদ স্যার প্রক্টরিয়াল কমিটির কিছু একটা হয়েছেন। ঠিক পদটা মনে পড়ছে না।

নাসরিন: (সাঈদ) স্যার এ্যাসিসট্যান্ট প্রক্টর ছিলেন বোধহয়, চার এ্যাসিসটেন্টের একজন।

সায়দিয়া: আর নাসিম ম্যাডাম নওয়াব ফয়জুন্নেসা হলের প্রভোস্ট। সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট ও ছাত্র ইউনিয়নও ক্যাম্পাসে ধর্ষণ নিয়ে কথা-বার্তা বলছে. পোস্টারিং করছে। ক্যাম্পাসে ধর্ষণের গুজব আরও জোরালো হয়েছে। এই গুজব নিয়ে কথা বলছি, যে যা শুনেছি লিখে রাখছি — এসব আলাপের এক পর্যায়ে আমরা ঠিক করলাম, বুঝতে পারলাম আমাদের আরও সংগঠিতভাবে কাজ করতে হবে, সেটা কি আমরা তখনও জানি না। যেহেতু আমারদের আগের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রমটা ছিল আন্তর্জাতিক নারী দিবস উদযাপন, আমরা আমাদের সংগঠনের নাম দিলাম ৮ই মার্চ পর্ষদ।

নাসরিন: আচ্ছা। তুমি একটা নারীবাদী ছাত্রী সংগঠনে যুক্ত হবার সাথে তোমার শিক্ষকদের Radical teaching এর প্রসঙ্গটি যে এতো গুরুত্ব দিয়ে আনলে চলো সে নিয়েই আলাপ করা যাক। বিশেষ করে এখন যখন শিক্ষকদের মান মর্যাদা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সমাজ শিক্ষকদের ওপর কল্যাণকর রূপান্তরের গুরু দায়িত্ব দিয়ে রেখেছে এটাই কি তুমি মনে কর? তোমার মতে র‌্যাডিকাল শিক্ষকতা কেমন হওয়া উচিত? তোমার শিক্ষকতার এবং শিক্ষার্থী থাকার অভিজ্ঞতা থেকেই বল।

সায়দিয়া: আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে কখনও শিক্ষকতা করিনি। একজন শিক্ষার্থী হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা জীবন ও শিক্ষকতার সম্পর্কে যা জেনেছি, বুঝেছি, পড়েছি তার প্রেক্ষিতে আমার যা মনে হয় সেটাই বলতে পারি। আমাদের ৮ই মার্চ পর্ষদ গড়ে তোলার ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতেই বলছি। ৮ই মার্চ পর্ষদের কয়েকজনের জন্য শিক্ষা ছিলো- মুক্তিদায়ী। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরুষাধিপত্যকে চিনতে শিখেছিলাম, সেটার বিরুদ্ধে লড়াই করতে, আওয়াজ তুলতে শিখেছিলাম।

তাই বিভিন্ন সময় শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ বিরোধী আন্দোলন ও এই মুহূর্তের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমাজ বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে নিয়ে যে অসন্তোষ প্রকাশ করছে তার থেকে আমার দূর্ভাবনাগুলো ভিন্ন। আমার কাছে মনে হয় শিক্ষকতার সম্পর্কেরই (relations of education) বাণিজ্যিকীকরণ হয়েছে। যেমন ধর, নৃবিজ্ঞান বিভাগের একজন শিক্ষক তার শিক্ষার্থীর সাথে সম্পর্কস্থাপন করছেন পাশ করলে আইসিডিডিআরবিতে ভালো বেতনের চাকরী জুটিয়ে দেবেন এই আশ্বাস দিয়ে। অথবা কোনও শিক্ষার্থীকে তার কনসালটেন্সীতে এ্যাসিসটেন্ট হিসেবে সুযোগের আশ্বাস দিয়ে। বাণিজ্যিকভাবে সান্ধ্যকালীন কোর্স চালু হওয়া থেকেও শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কের এই পরোক্ষ monetization, বাণিজ্যিকায়ন আমাকে ভাবায়। আমি dominant trend নিয়ে কথা বলছি, এর বাইরে অনুশীলন নেই সেটা আমি দাবি করছি না কিন্তু…

বা ধর শিক্ষার যে মতাদর্শিক বাণিজ্যিকায়ন, মানে আমি বলছি বাজারমুখী সিলেবাস, নতুন নতুন বিভাগ খোলার ক্ষেত্রে বাজারে কোন বিষয়ের কাটতি আছে সেগুলোই প্রাধাণ্য পাচ্ছে। বেতন-বৃদ্ধির আন্দোলন বা শিক্ষার পাবলিক-প্রাইভেট বিভাজনের বিরূদ্ধে সংগঠিত প্রতিবাদে যেভাবে পাবলিক এডুকেশনের বিষয়টি আলোচিত হয়, তাতে মনে হতে পারে শিক্ষা ব্যাবস্থার সংকট রাষ্ট্রের সাবসিডি আর আর্থিক মিটমিমাংসার ব্যাপার। এর বাইরে অন্যকিছু নিয়ে সচরাচর আলাপ হতে দেখি নাই। যখন হয়, তখনও আলাপটা গণমুখী শিক্ষার দাবীর মধ্যে ঘুরপাক খায়, আমার মনে হয় গণমুখী শিক্ষা ও লড়াকু শিক্ষা ব্যবস্থ্যার মধ্যে ফারাক আছে। দ্বিতীয়টি status quo  শিক্ষা ব্যাবস্থাকে/শিক্ষকতাকে ভাঙ্গার কথা বলছে।

এই যে রোজদিন প্রথম আলোতে উচ্চ শিক্ষা ব্যবস্থা ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কাজ ও সামাজিক অবদান নিয়ে লেখা ছাপা হচ্ছে সেখানে মুক্তিকামী শিক্ষা ব্যাবস্থা যাকে পাওলো ফ্রেইরী, Liberating education বলছেন তানিয়ে কোনও আলাপ আমার চোখে পড়েনি। এই অনুল্লেখ আমাকে বিচলিত করে রেখেছে। কথা হচ্ছে উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গবেষণাখাতে বরাদ্দ নিয়ে, কথা হচ্ছে উচ্চ শিক্ষায় বিনিয়োগ নিয়ে, বিদ্যমান বেতন ব্যবস্থা, সরকারী বিধিমালা, মন্ত্রি-সচিবদের শিষ্টাচার নিয়েও কথা হচ্ছে। এগুলো সন্দেহাতীতভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ। তবে শিক্ষক-শিক্ষার্থী নির্বিশেষে যে রবীন্দ্রনাথের তোতাকাহিনীর তোতার মতন খাঁচায় বন্দী, পেটে মুখস্থ বিদ্যা, চোখে বিশ্ব ব্যাংকের বা তথাকথিত নিওলিবারেল উন্নয়ন নীতির প্রতি আস্থা, সেই তোতার খাঁচা ভাঙ্গার গল্প করতে কাউকে শুনি না। পাওলো ফ্রেইরীর মুক্তিকামী শিক্ষার স্বরূপ নিয়ে বাহাস তেমন একটা নেই। খুব সীমিত পরিসরে, ৮ই মার্চ পর্ষদে লড়াকু শিক্ষকতার, মুক্তিদায়ী শিক্ষার স্বাদ পেয়েছিলাম। আমরা এই খাঁচা ভাঙ্গার গল্প করতাম। ছোট মুখে বড় কথা বলার সাহস পেয়েছিলাম।

আমাদের ৮ই মার্চ পর্ষদের একজন সদস্য, আনু মুহাম্মদের অফিস ঘরের টেবিলে একটা sticker লাগানো ছিল। সেই কত আগের কথা। প্রায় বিশ বছর। পাওলো ফ্রেইরীর সেই উক্তিটা আমার আজও মনে আছে, “Liberating education is acts of cognition, not transferals of information.”

এই আলাপের সূত্রে যে সকল শিক্ষক আমাকে সামাজিক বৈষম্য ও অন্যায় চেনার তৃতীয় নয়ন দিলেন, ছোট মুখে বড় কথা বলতে শেখালেন, ক্ষমতার সাথে বেয়াদবী করতে শেখালেন তাদের প্রতি অপরিসীম কৃতজ্ঞতা জানাতে চাই।

তোমার সাথে যৌন নিপীড়ন বিরোধী আন্দোলন নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে লতায়-পাতায় অনেক কিছু মনে পড়ল, লড়াকু পাঠদান/শিক্ষকতা নিয়ে ভাববার সুযোগ তৈরি হল। ধন্যবাদ, বন্ধু।

নাসরিন: ধন্যবাদ তোমাকেও। আমাদের আলোচনা চলবে।

Advertisements

One thought on “ঠোঁটকাটা আলাপ: যৌন নিপীড়ন বিরোধী আন্দোলন, ৮ই মার্চ পর্ষদ ও র‌্যাডিকাল শিক্ষকতা

  1. পাওলো ফ্রেইরির প্রসঙ্গ উত্থাপনটা বেশ ভালো লাগলো। আলাপটা আরো গভীরে যেতে পারতো। আরো বোধহয় ভালো হতো যদি আলাপটা এই জায়গা থেকে শুরু হতো অথবা এই বিষয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণ একটা আলাপ হতো। আরো কিছুক্ষণ যদি এই বিষয়ে ‘সায়দিয়া’র মতামত পড়তে পারতাম তবে জানতে পারতাম, তোতাপাখি শিক্ষা থেকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কতটা বের হয়ে আসতে পেরেছে।

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s